২২ বছরেও উদঘাটন হলো না সালমান শাহ হত্যার রহস্য !

বৃহস্পতিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮:৪২ অপরাহ্ণ | 914 বার

২২ বছরেও উদঘাটন হলো না সালমান শাহ হত্যার রহস্য !
ফাইল ফটো
Advertisements

কোটি বাঙালির প্রাণের নায়ক সালমান শাহ মৃত্যুর পর কেটে গেছে ২২টি বছর। আর এতগুলো বছরেও কুল কিনারা হলো না হার্টথ্রুব এই নায়ক হত্যার। কবে হবে বিচার তাও জানেন না কেউ। একের পর এক মামলার তদন্ত কাজ পিছিয়ে যায়, আর দুরে সরে যায় তার হত্যার রহস্য উদঘাটনের আলো।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনে নিজের বাসায় ফ্যানের সঙ্গে চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার (ইমন) ওরফে সালমান  শাহ’র ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। আজ তার ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে সালমান শাহকে স্মরণ করছে গোটা ইন্ডাস্ট্রি ও সিনেমাপ্রেমি অগণিত মানুষ। এছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতিতে কোরআন খতম ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেও তার স্মরণে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে।

Salman-4

তার অকাল মৃত্যু গোটা সিনেমা জগতকে যেন অন্ধকারের অতল গহ্বরে ফেলে দিয়েছে। আর সেখান থেকে উঠেও দাঁড়াতে পারছে না ঢাকাই সিনেমা। মাত্র তিন বছরের ক্যারিয়ারে যেই নায়ক ২৭টি ছবিতে অভিনয় করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো, যার অধিকাংশই দর্শকনন্দিত এবং ব্যবসাসফল ছবি, সেই নায়কের অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আর যদি সেই মৃত্যুতে জড়িয়ে যায় গভীর রহস্য, তাহলে তো ব্যথার পরিমাণ আকাশ ছুঁয়ে যাবেই।

সালমান শাহর মৃত্যুকে কেউ কেউ আত্মহত্যা হিসেবে আখ্যা দিলেও সালমানের পরিবার ও তার অগণিত ভক্ত জোর দিয়েই বলেছেন এটা খুন। সেই সুবাদে সালমান শাহ’র পরিবার থেকে একটি খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছিলো। কিন্তু তদন্তের শ্লথ গতি আর প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে আজও উন্মোচিত হয়নি আসল সত্য।

Salman-7

এরই মধ্যে কেটে গেলো ২২টি বছর। দর্শকের নিখাদ ভালবাসায় বেঁচে আছেন সালমান শাহ। কিন্তু তার মৃত্যু রহস্য যেন ধামাচাপা পড়ে গেছে। মাঝে মধ্যে তার কিছু অন্ধ ভক্ত এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সেই দাবি কেবলই ফেসবুকের পাতায় ঘুরেছে। আমলে নেননি কেউই।

গত বছরের আগস্টে সালমান শাহ’র মৃত্যুর রহস্যটি নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমেরিকা প্রবাসী রাবেয়া সুলতানা রুবি নামের একজন নারী সালমানের মৃত্যু প্রসঙ্গে একটি ভিডিও বার্তা দেন। সালমান শাহ হত্যা মামলার এই অন্যতম আসামী তার ভিডিওতে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি। তাকে খুন করা হয়েছে। এবং সেই খুনের সঙ্গে সালমানের স্ত্রী সামিরা ও সামিরার পরিবার এবং তার নিজের স্বামী ও ভাই জড়িত বলেও স্বীকার করেন রুবি।

Salman-5

এমন তথ্য উঠে আসার পর গোটা দেশে যেন আবারও সালমান ভক্তরা ফুঁসে ওঠে। তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে হুংকার ছাড়তে থাকে। গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে সালমান শাহ সংশ্লিষ্ট সব শিরোনাম। রহস্যের অনেক ক্লু প্রকাশ হতে থাকে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলাটির পুনঃতদন্তের জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেয়। রুবির খোঁজেও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা শোনা যায়। সবার মনেই একটা আশা জেগে ওঠে যে, দীর্ঘ দিন পরে হলেও সালমান শাহ হত্যা রহস্যের কিনারা মিলবে হয়ত। আর অপরাধীরাও সাজা পাবেন।

কিন্তু দু’দিন পর আবার সব যেন পাল্টে যায়। নিজের স্বীকারোক্তি থেকে সরে এসে ভিন্ন কথা বলেন রুবি। সুর পাল্টে তিনি জানান, তিনি যা বলেছেন, সব ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। মানসিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে নিজের সব স্বীকারোক্তিকে অস্বীকার করে নেন রুবি।
ব্যাস, এখানেই যেন ইতি ঘটে গেলো সালমান শাহ হত্যা রহস্য উন্মোচনের শেষ আশাটুকুর।

একদিকে প্রশাসনের নিরব ভূমিকা আর অন্যদিকে গণমাধ্যমের চুপসে যাওয়া, বিষয়টাকে যেন ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। রহস্য উন্মোচনের আশার প্রদীপ খানিকটা জ্বলে উঠেও যেন আবার নিভে যাচ্ছে। অন্যদিকে আদালতে সালমান শাহর হত্যার রহস্য উদঘাটনের মামলার রায় দিনের পর দিন পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। তবে কি সালমান শাহ হত্যার অজানা সত্য আজীবন আড়ালেই থেকে যাবে?

সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত কতদুর?

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ১৮ নভেম্বর দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আদালত। সোমবার (২০ আগস্ট) পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পুনঃতদন্তের প্রতিবেদন দাখিল না করায় ঢাকা মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাস পুনরায় দিন ধার্য করেন।

পুনরায় দিন ধার্যের বিষয়টি জানিয়েছেন বাদীপক্ষে সালমান শাহ’র আইনজীবী ফারুক আহম্মদ।

তিনি বলেন, সোমবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা না দেয়ায় নতুন তারিখ ধার্য করেছেন আদালত।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্র নায়ক সালমান শাহ। সে সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।

পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করার আবেদন জানান তিনি। অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত।

salman-shah

৩ নভেম্বর ১৯৯৭ সালে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে উক্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সিআইডি’র প্রতিবেদন প্রত্যাখান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন।

২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। এরপর প্রায় ১৫ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল।

২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান এবং ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন বলে আবেদন করেন।

২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬ এর বিচারক ইমরুল কায়েস রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনটি মঞ্জুর করেন এবং র‌্যাবকে মামলাটি আরও তদন্ত করার আদেশ দেন।

সালমান শাহ’র জন্ম ও অভিনয় :-

সালমান শাহ ১৯৭১ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলায় অবস্থিত জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রাশি ছিল বৃশ্চিক।  পিতা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা নীলা চৌধুরী। তিনি পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন। যদিও তাঁর জন্মনাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন, কিন্তু চলচ্চিত্র জীবনে তিনি সবার কাছে সালমান শাহ বলেই পরিচিত ছিলেন।

শিক্ষা
সালমান পড়াশুনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। একই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমী তার সহপাঠী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকার ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বি.কম. পাস করেন।

পারিবারিক জীবন
সালমান শাহ ১২ আগস্ট ১৯৯২ তাঁর খালার বান্ধবীর মেয়ে সামিরা হককে বিয়ে করেন। সামিরা হক ছিলেন একজন বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী। তিনি সালমানের ২টি চলচ্চিত্রে তাঁর পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেন।

অভিনয়জীবন : নাটকে অভিনয়
সালমান ১৯৮৫ সালে বিটিভির আকাশ ছোঁয়া নাটক দিয়ে অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেন। পরে দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), সৈকতে সারস (১৯৮৮), নয়ন (১৯৯৫), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬) নাটকে অভিনয় করেন। নয়ন নাটকটি সে বছর শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে। এছাড়া তিনি ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত পাথর সময় ও ১৯৯৪ সালে ইতিকথা ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন।

Salman-6

চলচ্চিত্রে অভিষেক
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে সালমান শাহ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দ মেলা তিনটি হিন্দি ছবি ‘সনম বেওয়াফা’ ‘দিল’ ও ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ এর কপিরাইট নিয়ে সোহানুর রহমান সোহানের কাছে আসে এর যে কোন একটির বাংলা পুনঃনির্মাণ করার জন্য।

কিন্তু তিনি উক্ত ছবিগুলোর জন্য উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা খুঁজে না পেয়ে সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। নায়িকা হিসেবে মৌসুমীকে নির্বাচিত করলেও নায়ক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন নায়ক আলমগীরের সাবেক স্ত্রী খোশনুর আলমগীর ‘ইমন’ নামে একটি ছেলের সন্ধান দেন। প্রথম দেখাতেই তাকে পছন্দ করে ফেলেন পরিচালক এবং সনম বেওয়াফা ছবির জন্য প্রস্তাব দেন, কিন্তু যখন ইমন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির কথা জানতে পারেন তখন তিনি উক্ত ছবিতে অভিনেয়র জন্য পীড়াপীড়ি করেন।

তাঁর কাছে কেয়ামত সে কেয়ামত তক ছবি এতই প্রিয় ছিলো যে তিনি মোট ২৬ বার ছবিটি দেখেছেন বলে পরিচালক কে জানান। শেষ পর্যন্ত পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তাঁকে নিয়ে কেয়ামত থেকে কেয়ামত চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ইমন নাম পরিবর্তন করে সালমান শাহ রাখা হয়। পরে মৌসুমীর বিপরীতে তিনি আরও তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছবি তিনটি হল অন্তরে অন্তরে (১৯৯৪), স্নেহ (১৯৯৪) ও দেনমোহর (১৯৯৫)। শিবলী সাদিক পরিচালিত অন্তরে অন্তরে হিন্দি চলচ্চিত্র আও পেয়ার করের আনঅফিসিয়াল রিমেক, স্নেহ পরিচালনা করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও শফি বিক্রমপুরী পরিচালিত দেনমোহর হিন্দি চলচ্চিত্র সনম বেওয়াফার অফিসিয়াল রিমেক।

Salman-2

চলচ্চিত্রে সাফল্য
তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র জহিরুল হক ও তমিজউদ্দিন রিজভী পরিচালিত তুমি আমার চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল হয়। পরিচালক জহিরুল হক চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ নির্মাণ করার পর মারা যান। পরে তমিজউদ্দিন রিজভী বাকি কাজ শেষ করেন। এই চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মত তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন শাবনূর। পরে তার সাথে জুটি বেধে একে একে সুজন সখি (১৯৯৪), বিক্ষোভ (১৯৯৪), স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৪), মহামিলন (১৯৯৫), বিচার হবে (১৯৯৬), তোমাকে চাই (১৯৯৬), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬), জীবন সংসার (১৯৯৬), চাওয়া থেকে পাওয়া (১৯৯৬), প্রেম পিয়াসী (১৯৯৭), স্বপ্নের নায়ক (১৯৯৭), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), বুকের ভিতর আগুন (১৯৯৭) সহ মোট ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সবকটি ছবি ব্যবসাসফল হয়।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh