সুদে কারবারিদের চাপে ঘরছাড়া সেই পরিবারের পাশে ইউএনও

মঙ্গলবার, ১৪ মে ২০১৯ | ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ | 842 বার

সুদে কারবারিদের চাপে ঘরছাড়া সেই পরিবারের পাশে ইউএনও
ইউএনও সরকার অসীম কুমার ময়ুরী খাতুনের সাথে কথা বলছেন।
Advertisements

পাবনার চাটমোহরে সুদে কারবারীদের চাপে ঘরছাড়া সেই দরিদ্র ভ্যান চালক নজরুলের পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও সরকার অসীম কুমার। সোমবার সকালে ইউএনও’র কার্যালয়ে নজরুলের স্ত্রী ময়ুরী খাতুনকে ডেকে তাদের নানা অসুবিধার কথা শোনেন।

পরে ইউএনও সরকার অসীম কুমার ময়ুরী খাতুনকে স্বাবলম্বী করে তুলতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন দেওয়ার আশ্বাস দেন।

এছাড়া তার হাতে তুলে দেন শুকনা খাবার। এ সময় ইউএনও সুদে কারবারিদের সুদের টাকা দিতে বারণ করেন এবং ময়ুরী খাতুনকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন এবং যে কোন সমস্যা জানাতে ইউএনও তার ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার ময়ুরী খাতুনকে দেন।

এরআগে গত রোববার বিশ্ব মা দিবসের দিন ছাইকোলা গ্রামের নাহিদ হাসান নামে এক যুবক ‘নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছেন আপন মা। সুধের টাকা শোধ দিতেই এমন আয়োজন’-এমন শিরোনামে তার ফেসবুক টাইম লাইনে এবং চেতনায় চাটমোহর নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দেন।

(ফেসবুকের এই পোস্টের মাধ্যমেই তোলপাড় শুরু হয়)

মুহূর্তেই পোস্টটি ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং প্রশাসন থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। সেই ফেসবুক পোস্টে সন্তান বিক্রি করতে চাওয়া মা এবং তার পরিবারের সবকিছু জানতে চেয়ে এবং এর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে কমেন্টস করেন ইউএনও সরকার অসীম কুমার।

পরে হান্ডিয়াল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের তত্বাবধানে ময়ুরী খাতুন সেই সন্তানসহ সোমবার সকালে ইউএনও’র কার্যালয়ে হাজির হন।

(ময়ুরী খাতুনের হাতে শুকনা খাবার তুলে দিচ্ছেন ইউএনও)

এই প্রতিবেদককে ময়ুরী খাতুন জানান, উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের বৃ-রায়নগর গ্রামে তাদের বাড়ি। তার স্বামী দরিদ্র ভ্রান চালক নজরুল ইসলাম দীঘদিন ধরে নানা অসুখে ভূগছেন। চিকিৎসা এবং সংসার চালাতে গিয়ে তিনি ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েন।

বেশ কিছুদিন আগে তার স্বামী নজরুল ইসলাম প্রতিবেশী দু’জন এবং পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ বাজার এলাকার বেশ কয়েকজন সুদে কারবারির কাছ থেকে টাকা ধার করেন।

যা পরবর্তীতে সুদে আসলে প্রায় দেড় লক্ষাধিক টাকার ওপরে গিয়ে দাঁড়ায়। পরে টাকা দিতে না পারায় সন্তান সম্ভবা স্ত্রী ময়ুরী খাতুনকে তার ভায়রার বাড়ি একই ইউনিয়নের চরএনায়েতপুর গ্রামে রেখে সুদে কারবারিদের চাপে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।

এরমধ্যে গত বিশ দিন পূর্বে ময়ুরী খাতুন তার বোন জামাইয়ের বাড়িতে থাকাবস্থায় চতুর্থতম সন্তান প্রসব করেন।

দুই সন্তানকে নিয়ে ইউএনও সরকার অসীম কুমারের কার্যালয়ে ময়ুরী খাতুন (বামে)

এদিকে সুদে কারবারিদের চাপে বাড়ি ফিরতে না পেরে এবং স্বামীর কোন খোঁজ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন ময়ুরী খাতুন। বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু ফিরতে গেলে শোধ করতে হবে সুদে কারবারিদের টাকা।

এরপর চরএনায়েতপুর গ্রামের নিঃসন্তান জনৈক এক শিক্ষক ময়ুরী খাতুনের সদ্য ভূমিষ্ঠ ছেলেকে দত্তক নেওয়ার প্রস্তাব দেন। বিনিময়ে তিনি কিছু টাকা দেবেন বলে জানান। তবে ছেলে বিক্রি নয়, সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের চিন্তা করে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ময়ুরী খাতুন।

তবে এতে আপত্তি জানান স্বামী নজরুল ইসলাম। অবশেষে ইউএনও সরকার অসীম কুমারের হস্তক্ষেপে দুশ্চিন্তামুক্ত হয় অসহায় পরিবারটি।

ময়ুরী খাতুন বলেন, আমার চার ছেলে। সুদের টাকার জন্য স্বামী ঘড়ছাড়া। তবে ছেলেকে বিক্রি করতে চাইনি কখনও। কোন মা তার ছেলেকে কি বিক্রি করতে চায়? তবে আত্মীয় স্বজনসহ অনেকেই চাপাচাপি করলে ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ওই মাস্টারকে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু স্বামী কাছে না থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।

তবে ইউএনও স্যার আমাদের পরিবারের জন্য যা করলেন তা কোনদিন ভুলবো না।

বিষয়টি জানতে চেয়ে ময়ুরী খাতুনের স্বামী নজরুল ইসলামের মোবাইলে যোগাযাগ করা হয়। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ছেলে বিক্রি বা দত্তক দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি ঋণগ্রস্থ হয়ে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে ছিলাম। সোমবার এমন ঘটনা শুনে আমি ভায়রার বাড়ি চরএনায়েতপুরে এসেছি। তবে আমাদের বিপদের কথা শুনে ইউএনও স্যার এগিয়ে আসায় এখন একটু স্বস্তি পাচ্ছি।

ইউএনও সরকার অসীম কুমার জানান, ময়ুরী খাতুন আমার অফিসে এসেছিলেন। মুলত তারা ধারের টাকা শোধ করতে না পেরে এমন বিপদে পড়েছেন। তাকে (ময়ুরী) স্বাবলম্বী করে তুলতে সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এছাড়া তার স্বামী যদি কোন ব্যবসা করতে চায় তাহলে সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে ছেলে বিক্রি করার বিষয়টি সঠিক নয়। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে সবসময় অসহায় মানুষের পাশে আছি এবং থাকবো বলে জানান এই কর্মকর্তা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh