সহিংস অক্টোবর ছড়াক অহিংসার আলো

মঙ্গলবার, ০২ অক্টোবর ২০১৮ | ৯:৩৯ অপরাহ্ণ | 559 বার

সহিংস অক্টোবর ছড়াক অহিংসার আলো

সময়কাল-অক্টোবর ২০০৬
সেবার ঈদ উৎসবটা অনেক আগেই শুরু হয়েছিলো। যে উৎসবে বাড়ি ফেরার তাড়া ছিলো না, টিকিট কাটার লাইন ছিলো না ! বাসে ট্রেনে অস্বাভাবিক ভিড়ও ছিলো না!

তবে ঈদের মতোই খুশি ছিলো, আনন্দ ছিলো, ছিলো বিশ্বকে কিছু দিতে পারার গর্ব। একজন বাংলাদেশীর (ডঃ ইউনুস) নোবেল জয় ঈদের ঠিক ১৩ দিন আগেই পুরো জাতিকে এনে দিয়েছিল সার্বজনীন এক আনন্দের উপলক্ষ।

কিন্তু শান্তিতে নোবেল জয় এদেশের মানুষকে আনন্দিত করলেও শান্তি এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছিলো। তাইতো সেসময় রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত হয়েছিলো, রক্তাক্ত হয়েছিলো, রাজপথ। লগি বৈঠার আঘাতে সাপের মতো মরেছিলো মানুষ। মৃত মানুষের লাশের উপর হয়েছিলো উদ্দাম নৃত্য। যে দৃশ্য হার মানিয়েছিল কোন অ্যাকশন-থ্রিলার ছবিকেও। আমি জানিনা কোন ড্রামাক্রিটিক এই দৃশ্যকে কিভাবে নিতেন।

বিংশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ড্রামাক্রিটিক ছিলেন কেনেথ টাইনান। উপন্যাসিক হিসেবে সমাদৃত এবং নাট্য সমালোচক হিসাবে বিখ্যাত টাইনান কখনো নাটক লেখেননি! কেন নাটক লেখেননি এমন এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন-
একজন মানুষ তার জীবনে কলম দিয়ে যা কিছু লিখতে পারে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হলো নাটক লেখা”।

কঠিন বলেই হয়তো টাইনান নাটককে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি বলে যাননি, আমাদের জীবনটাই একেকটা নাটক, আর সে নাটক এড়ানো সম্ভব নয়! সেটা ব্যক্তি জীবনেই হোক কিংবা জাতীয় জীবনে!

তাইতো ২৮ অক্টোবর’০৬ বাংলাদেশ এড়াতে পারেনি রাজপথের লগি বৈঠার নাটক। কোন মঞ্চ কিংবা টিভি নাটকের সাথে এ লগি বৈঠার নাটকের বৈসাদৃশ্য হলো-

টিভি নাটকে ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে স্ট্যানম্যান ব্যবহার করা হয়। যেখানে রক্ত ঝরে না, ঝরে আলতা। কিন্তু ২৮ অক্টোবরের সেই লগি বৈঠার নাটকের মানুষগুলো কোন স্ট্যানম্যান ছিলো না। লগি বৈঠার আঘাতে তাদের শরীর থেকে আলতা ঝরেনি বরং রক্তই ঝরেছিলো।

সময়কাল- অক্টোবর ২০১৮
আশ্বিন মাসের শেষ সপ্তাহ চলছে। বাংলা প্রবাদে একটা কথা আছে- আশ্বিন, গা শিন শিন। কিন্তু জলবায়ুগত পরিবর্তনে়, আশ্বিনে পড়ে না গা শিন শিনে শীত, সব কিছুই যে এখন সুসময়ের বিপরীত। পৃথিবীই তো এখন উঞ্চ হয়ে উঠছে।

নির্বাচনের আর মাত্র ৩ মাস বাকি। আর কিছুদিনের মধ্যেই ঘোষনা হওয়ার কথা নির্বাচনী ইশতেহার। এমন সময়েও সকলের মনে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে-

আগামী সংসদ নির্বাচন কি আদৌ হবে?
নির্বাচন হলে কার অধীনে হবে?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী ফিরে আসবে? নির্বাচনের আগে কী মুক্তি পাবে খালেদা জিয়া?
বিএনপি কী খালেদা জিয়া ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে?

যদি নির্বাচনের আগে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সমঝোতা না হয় তবে কি ২৮ অক্টোবরের ২০০৬ এর মতো রাজপথ আবারো সংঘাতের দিকে যাবে? আমরা কি এগিয়ে যাচ্ছি, আরেকটি লগি বৈঠার তান্ডবের দিকে?

আমি ভাবছিলাম, ২০০৬ এর প্রশ্নগুলো কি নিদারুণভাবে ২০১৮ তে করতে হচ্ছে! ২০০৬ এর অক্টোবর আর ২০১৮ এর অক্টোবর একই প্লাটফর্মে রয়েছে। ১২ বছরের ব্যবধানে দেশটার অবস্থান একই স্থানে!

আশ্চর্য! সেই ১৯৫৮ থেকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এই দেশে আন্দোলন চলছে। ৭১’এবং ৯০ এ সেই আন্দোলন চরমে পৌঁছেছিল। তারপর কিছুদিন বেসামরিক শাসনের পর আবার কিভাবে যেন ঘুরেফিরে সামরিক কিংবা অসাংবিধানিক সরকারই ফিরে আসছে। ফিরে আসছে অসাংবিধানিক সরকারের আশংকা।

সেই ৯০ থেকে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই দেশে আন্দোলন চলছে। তারপরও প্রতিটি নির্বাচনেই চলছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা। জনগনের ভোটের অধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ খেলাই ঘুরেফিরে চলছে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬, ২০১৪ এ, এমনকি ২০১৮ তেও।

আসলে আলোচনা করার জন্য আমাদের চায়ের কাপ উষ্ণ হলেও জীবনটা বড় একঘেয়ে-

একটা রেকর্ডের মাঝেই যেন আটকে গেছে গ্রামোফোনের পিন! বারবার একই সুরে একই কথায় রেকর্ডটা বাজছে। গণতন্ত্রের জন্য, প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবীতে চিৎকার করতে করতেই কি জীবনটা শেষ হয়ে যাবে? দেশটা কি একটুও এগোবে না? আমরা কি এগিয়ে যাবো আরেকটি লগি বৈঠার তান্ডবের দিকে? রাজপথের নৃশংস হত্যাকান্ডের দিকে?

আরেকটি ওয়ান/ইলেভেনের দিকে? আরেকটি ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন আর সে নির্বাচন প্রতিরোধ করা জ্বালাও পোড়াওয়ের দিকে?
এ সকল অস্থির ভাবনার মাঝে আমি দেখছিলাম, আজকের দিনপঞ্চি-

আজ ২রা অক্টোবর, আন্তর্জাতিক সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস বা আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস।

১৮৬৯ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অখন্ড- ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনীতিবিদ এবং অখন্ড- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তি মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী।

যিনি ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। যে আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো অহিংস মতবাদ বা দর্শনের ওপর এবং এটি ছিলো ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি। সারা বিশ্বের মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার পাওনায় আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা।

মহান এ নেতার স্মরণে ভারত সরকার দিবসটিকে গান্ধী জয়ন্তী হিসাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করলেও ২০০৭ সালে জাতিসংঘ দিবসটিকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসাবে পালনের ঘোষণা দেয়।

এ অক্টোবরেই জন্ম নিয়ে মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী অহিংসার যে আলো ছড়িয়েছেন, সে আলো তাকে করেছিলো মহাত্মা আর বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিয়েছিলো ঘৃনার বিপরিতে ভালোবাসার মন্ত্র!!!

আমি ভাবছিলাম, ২০০৬ এর সহিংস অক্টোবর কী ২০১৮ তে অহিংস রূপ নেবে? রাজপথে সহিংসতার বিরুদ্ধে, রক্ত ও জীবন নাশের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে দেবে অহিংসার আলো !?

যে আলোয় আন্তর্জাতিক সহিংসতা প্রতিরোধ দিবসেই সুষ্ঠু নির্বাচন আর গণতন্ত্র সুরক্ষার আন্দোলনে অহিংস হয়ে উঠবে দীর্ঘকাল রাজনৈতিক সহিংসতায় আক্রান্ত এ জাতি।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টঃ WebNewsDesign