নিখোঁজ শ্রমিকের পরিবারে শোকের মাতম

শোকের চাদরে ঢাকা ভাঙ্গুড়ার ৪টি গ্রাম

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ২:১৬ অপরাহ্ণ | 856 বার

শোকের চাদরে ঢাকা ভাঙ্গুড়ার ৪টি গ্রাম
নিখোঁজ তুহিনের স্বজনদের আহাজারী
Advertisements

‘মাত্র ছয় মাস আগে তুহিন হোসেনের সাথে বিয়ে হয়েছে মুসলিমা খাতুনের। হাতের মেহেদীর রঙ মুছতে না মুছতেই স্বামীকে হারালেন তিনি। স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিয়ে শখ আহলাদ মেটানোর সময় পেলেন না প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে। ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ স্বামী তুহিন হোসেনের জন্য তার বুক ফাটা কান্নায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না কেউই।’

‘চার ছেলের মধ্যে দ্বিতীয় তুহিনের বাবা ছায়দার আলীর আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। তাকে থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ দুই ভাইও কেঁদে উঠছেন। ছেলেকে এনে দাও বলে মাঝে মাঝে মুর্ছা যাচ্ছেন মা শাহিদা খাতুন।’

শুধু তুহিন হোসেনই নন, তার মতো একই ইউনিয়নের ১৮ জন শ্রমিক এখন পর্যন্ত নিখোঁজ থাকায় কান্না থামছে না স্বজনদের।

গত বুধবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে সরেজমিনে ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের মুন্ডুমালা, মাদারবাড়িয়া, চন্ডিপুর ও দাসমরিচ গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এমন পরিবেশ। গ্রামগুলো যেন এখন শোকের গ্রাম। পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

স্বজন হারিয়ে বাকরুদ্ধ অনেকেই। কারো সন্তান, কারো স্বামী আবার কারো বাবার সন্ধান না পেয়ে আহাজারী থামছে না তাদের। শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছে গ্রামগুলোর পরিবেশ। নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনদের স্বান্তনা দিতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না প্রতিবেশি ও এলাকাবাসী।

নিখোঁজ শ্রমিক মানিক হোসেনের স্ত্রী রুমা খাতুন স্বামীকে ফিরে পেতে বিলাপ করছেন। বলছিলেন, আপনারা আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিন। আমি এই বয়সে বিধবা হতে চাইনা ? আমার দুই সন্তানকে কে দেখবে। আমার দুই ছেলে কাকে বাবা বলে ডাকবে? মানিকের মা নাজমা খাতুন জানান, ১০ দিন আগে ১০ হাজার টাকা দাদন দিয়ে আমার ছেলেকে জোর করে নিয়ে গেছে আব্দুল হাই নামের এক লেবার সর্দার। তারপর মঙ্গলবার সকালে খবর পেলাম আমার ছেলে যে ট্রলারে ছিল সেটা ডুবে গেছে বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।

দুই ছেলে আলিফ ফকির ও মোস্তফা ফকির এবং এক জামাই রহমত আলী নিখোঁজ থাকায় পাগলপ্রায় বাবা জব্বার ফকির। সংবাদকর্মীদের কাছে পেয়ে তাদের পা ধরে সন্তান ও জামাইয়ের খোঁজ জানতে চাইছেন তিনি। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। কাঁদছেন আর যাকে কাছে পাচ্ছেন তার কাছে জানতে চাইছেন বেঁচে আছে তো?

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা জানান, গত ১১ দিন আগে একই ইউনিয়নের মাদরবাড়িয়া গ্রামের মাটি কাটার সরদার আবদুল হাই দাদন দিয়ে শ্রমিকদের নারায়গঞ্জের বক্তারখালী এলাকায় মাটি কাটার কাজে নিয়ে যায়। এরপর মঙ্গলবার (১৫ জানুয়ারি) ভোররাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ট্রলারে মাটি নিয়ে নারায়নগঞ্জের বক্তারখালী এলাকায় যাচ্ছিলেন শ্রমিকরা।

ট্রলারে থাকা শ্রমিকের মধ্যে কেউ ঘুমিয়েছিলেন, কেউবা জেগে। পথিমধ্যে ভোররাত সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে ট্রলারটি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার উপজেলার সীমান্তবর্তী কালিয়াপুর এলাকার মেঘনা নদীতে পৌঁছার পর একটি মালবাহী জাহাজের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে ১৪ জন সাঁতার জানায় প্রাণে বাঁচলেও ১৮ জন নিখোঁজ হয়।

নিখোঁজ ১৮ জন শ্রমিক হলেন, পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের মুন্ডুমালা গ্রামের গোলাই প্রামানিকের ছেলে ছোলেমান হোসেন, জব্বার ফকিরের ছেলে আলিফ হোসেন ও মোস্তফা ফকির, গোলবার হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-১, আব্দুল মজিদের ছেলে জাহিদ হোসেন, নুর ইসলামের ছেলে মানিক হোসেন, ছায়দার আলীর ছেলে তুহিন হোসেন, আলতাব হোসেনের ছেলে নাজমুল হোসেন-২, লয়ান ফকিরের ছেলে রফিকুল ইসলাম, দাসমরিচ গ্রামের মোশারফ হোসেনের ছেলে ওমর আলী ও মান্নাফ আলী, তোজিম মোল্লার ছেলে মোশারফ হোসেন, আয়ান প্রামানিকের ছেলে ইসমাইল হোসেন, সমাজ আলীর ছেলে রুহুল আমিন, মাদারবাড়িয়া গ্রামের আজগর আলীর ছেলে আজাদ হোসেন, চন্ডিপুর গ্রামের আমির খান ও আব্দুল লতিফের ছেলে হাচেন আলী এবং উল্লাপাড়া উপজেলার গজাইল গ্রামের তোফজ্জল হোসেনের ছেলে রহমত আলী।

এদিকে, বুধবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিনের নির্দেশে নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের খোঁজ নিতে যান ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুদুর রহমান। এ সময় তিনি প্রত্যেক পরিবারকে শুকনো খাবার ও শীতবস্ত্র হিসেবে কম্বল বিতরণ করেন।

ইউএনও মাসুদুর রহমান জানান, নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের খবর আমরা নিয়মিত রাখবো। তাদের পাশে দাঁড়াতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh