চলনবিলে নৌকাডুবি

শাহনাজ-সুমনের বীরত্বে প্রাণে বাঁচেন ১৭ নৌকা যাত্রী!

রবিবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০:১২ অপরাহ্ণ | 1823 বার

শাহনাজ-সুমনের বীরত্বে প্রাণে বাঁচেন ১৭ নৌকা যাত্রী!
শাহনাজ পারভীন ও সুমন হোসেন

আনন্দ ভ্রমন শেষে নৌকা ছুটছিল গন্তব্যের দিকে। সুর্যটা তখন ডুবুডুবু। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। তাই শেষবার সবাই মিলে একটা সেলফি তোলার চেষ্টা। নৌকার ছইয়ে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার মুহুর্তে আকষ্মিক নৌকার ছই ভেঙ্গে উল্টে যায় যাত্রী বোঝাই নৌকাটি। চারিদিকে শুরু হয় চিৎকার-চেঁচামেচি। ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে মানুষের আর্তনাদ।

ওই সময় বিলের মধ্যে থেকে একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কিশোর সুমন। আর বিলপাড়ের বাসিন্দা গৃহবধু শাহনাজ পারভীন দাঁড়িয়ে ছিলেন নদীর তীরে।

চোখের সামনে এমন দুর্ঘটনা দেখে আর মানুষের আর্তনাদ শুনে নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি তারা। নিজের জীবন বাজি রেখে নদীপাড়ে বেঁধে রাখা একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে ঘটনাস্থলে (নদীর মধ্যে) ছুটে যান শাহনাজ পারভীন। অন্যদিকে এগিয়ে আসেন কিশোর সুমনও।

তারা দু’জনে মিলে একে একে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন ডুবে যাওয়া নৌকার ১৭ জন যাত্রীকে। আর নিখোঁজ হন ৫ নৌকা যাত্রী। এরপর রবিবার সকাল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরী দলের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমে নিখোঁজ ৫ জনেরই মরদেহ উদ্ধারের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় উদ্ধার অভিযান।

গত শনিবার (০১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজখবর ডটনেটের অনুসন্ধানে উঠে আসে গত ৩১ আগস্ট দুর্ঘটনায় ত্রাতার ভুমিকা পালনকারী এই দুইজনের নাম। তাদের কাছ থেকেই জানা সম্ভব হয়, ঠিক কি কারণে আর কিভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

তাদের বয়ানে উঠে অাসে সেদিনের উদ্ধারের কাহিনী। কিন্তু সুমনের নাম বেশি উচ্চারিত হওয়ায় অনেকটা আড়ালে পড়ে যান শাহনাজ পারভীন। তবে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও তাদের স্বজনরা।

শাহনাজ পারভীন পাইকপাড়া গ্রামের আশরাফ আলীর স্ত্রী এবং সুমন হোসেন একই গ্রামের আবদুস সামাদের ছেলে ও হান্ডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। মুলত এই দুইজনের বীরত্বে আর বুদ্ধিমত্তায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান ১৭ জন। তা না হলে ঘটতে পারতো আরো বড় দুর্ঘটনা।

শনিবার দুপুরে পাবনার জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন শনিবার দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে এই ঘটনাটি জানার পর সুমনকে ‘বীর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাকে বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য শিক্ষা সহায়তা বাবদ নগদ ৫ হাজার টাকা প্রদান করেন এবং শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরকার অসীম কুমার, এএসপি (চাটমোহর সার্কেল) তাপস কুমার পাল, ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেনসহ অন্যান্যরা। তবে এই বীরত্বপূর্ণ কাজের কোন স্বীকৃতি পাননি শাহনাজ পারভীন!

তবে এক্ষত্রেও উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন শাহনাজ পারভীন। স্বীকৃতি না মেলায় কোন আক্ষেপ নেই তার। তিনি বলেন, ‘আমার কোন পুরস্কার লাগবি লয়, মানুষের জীবন বাঁচিছে, ইডাতই আমি খুশি।’

এদিকে একজন মেয়ে মানুষ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতোগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচানোয় শাহনাজ পারভীনের ভূয়সি প্রশংসা করেছেন গ্রামবাসী ও সচেতন মহল।

হান্ডিয়াল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন  বলেন, ‘সত্যিই শাহনাজ পারভীন ও সুমন এগিয়ে না গেলে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারতো। সুমনকে ডিসি স্যার পুরস্কৃত করেছেন। তবে শাহানাজ পারভীনের বিষয়টি অগোচরে থেকে গেছে।’

বেঁচে যাওয়া রফিকুল ইসলাম ও শফিউল বাশার নামে দু’জন নৌকা যাত্রী বলেন, ‘ওই মহিলা  (শাহনাজ পারভীন) ও ছোট্ট ছেলেটি (সুমন) না থাকলে আমরা বাঁচতাম না। তারা দু’জন আমাদের হাত ধরে নৌকায় তুলেছে। প্রাণে বাঁচিয়েছে। আমরা সবাই ওই দু’জনের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরকার অসীম কুমার বলেন, ‘ডিসি স্যার সুমনের শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। আর তাৎক্ষণিক শাহনাজ পারভীনের ব্যাপারে কিছু জানা না গেলেও পরে শুনেছি, তিনিও নৌকা যাত্রীদের উদ্ধার করেছেন।’

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শাহনাজ পারভীনকেও সার্বিক সহযোগিতা করা হবে বলে জানান ইউএনও।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টঃ WebNewsDesign