যৌতুক এবং দেনমোহর দুটোই এখনকার সমাজে স্ট্যাটাস সিম্বল

সোমবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১১:০০ অপরাহ্ণ | 1025 বার

যৌতুক এবং দেনমোহর দুটোই এখনকার সমাজে স্ট্যাটাস সিম্বল

নারী-পুরুষের সবচেয়ে মধুরতম সম্পর্ক হচ্ছে প্রেম, পরিণয় তথা বিয়ে নামের সামাজিক বন্ধন। সব সম্পর্কের মতো এখানেও নানা বাঁক আছে। কখনো কখনো এই সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নিয়ে অকার্যকর হয়ে উঠতে পারে, রূপান্তরিত হয় তথাকথিত সামাজিকতায় । অনেক সময় পরিবারের অতিরিক্ত লোভের কাছে হার মেনে যায় স্বপ্নকাতর প্রেমিক যুগলের সুন্দর সাজানো সংসার আর রঙিন স্বপ্নগুলো।

বিয়ে মানে, দুজন মানুষের সুখে-দুঃখে একসাথে জীবন কাটানোর অঙ্গীকার। এখানে যৌতুক কিংবা দেনমোহরের প্রশ্ন আসবে কেন! কিন্তু এটাই সত্য যে, যৌতুক এবং দেনমোহর দুটোই এখনকার সমাজে স্ট্যাটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছে।

‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ এর এই যুগে প্রতিটি পরিবার চায় তাঁর নিজের সন্তানটি যেন লেখাপড়ায় ভালো হয়, ক্যারিয়ারেও সবচেয়ে ভালো করে। অন্য অনেক দিকের চেয়েও আর্থিকভাকে প্রতিষ্ঠার চিন্তাই এখানে প্রাধান্য পায়।দুঃখজনক হলেও সত্য যৌতুকের কারণে অনেক পরিবারেই বিয়ের যোগ্য কন্যার পিতা-মাতার চোখে ঘুম আসে না, কারো কারো কাছে মাত্রাতিরিক্ত চাপে আদরের কন্যার জন্মকে অভিশাপ বলে মনে হয়। পরিবারের সমস্ত সুখ আর আনন্দ নিঃশেষিত হয় কন্যার সুখের জন্য। অপর দিকে সাধ্যের অতিরিক্ত দেনমোহর যা হয়তো ওই পুরুষের সারা জীবনের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল, অসুখী দাম্পত্যের ক্ষেত্রে স্বামীর গলায় ফাঁসের মতো পেঁচিয়ে থাকে। সহজ সমাধান বিবাহ বিচ্ছেদের চেয়ে তখন আত্মহননকে শ্রেয়তর মনে হয় ।

অতি সম্প্রতি চট্টগ্রামের চিকিৎসক দম্পতি আকাশ-মিতুর নির্মম বিচ্ছেদের জন্য দেনমোহরকে প্রধান উপজীব্য বলে মনে হয়। বেচারা আকাশ ৩৫ লাখ টাকা দেনমোহর দিয়ে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে আত্মঘাতি হতে বাধ্য হন। এমন অনেক প্রতিশ্রুতিশীল মানুষ যারা সমাজ এবং দেশকে অনেক কিছু দেওয়ার ক্ষমতা রাখে. তারা এরকমই দেনমোহরের ফাঁদে পরে অকালে হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সব অঞ্চলে যৌতুক এবং অতিরিক্ত দেনমোহরের চাপ থাকলেও চট্টগ্রামে ভয়াবহ অবস্থা। কেবল বিয়ের সময় নয়, রোজা, ঈদ, পিঠা-পুলি যে কোন পার্বণকে উপলক্ষ করে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যৌতুক আশা করে। ভাবখানা এমন মেয়ের বাপেরবাড়ি তাঁর শ্বশুরবাড়ির প্রতি ঋণ শোধ করছে। এতে করে যে মেয়ে এবং তাঁর উপযুক্ততার অবমাননা করা হয় এটা কারো মস্তিষ্কে ঢুকে না। রোজার সময় ইফতার, ঈদে সবার জন্য জামা-কাপড়, কুরবানি ঈদে গরু পাঠানো অবশ্যক, না হলে শ্বশুরবাড়িতে মেয়ের ইজ্জত শেষ। এই ঠুনকো ইজ্জতের জন্য মেয়েরাও প্রতিবাদী হয় না, প্রথা হিসেবে মেনে নেয়।

অনেকে বলে থাকেন, আমাদের ধর্মে বলা আছে সাধ্যের মধ্যে দেনমোহর দেওয়ার কথা। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি মিলত না তখন তাঁদের একমাত্র কাজ ছিল সংসার এবং সন্তানদের লালন পালন। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় দেনমোহর প্রথার প্রচলন ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগে নারীরা আর পিছিয়ে নেই । নারীরা এখন আত্মপ্রত্যয়ী,স্বয়ং সম্পূর্ণা, আমাদের দেশে সব সেক্টরেই এখন নারীরা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে, পরিবার, সমাজ, দেশকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে। তবে কেন মেয়ের পরিবারের উপর অহেতুক যৌতুকের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ! কিংবা স্বামী নামক অল্প বয়সী পুরুষের উপর বৃথাই দেন মোহরের চাপ !

বিয়ের পাত্র বা পাত্রী কেউই কারো থেকে কম নয়, কিন্তু বিয়ে মানে যেন বিকিকিনির হাঁট। এখানে কুরবানির গরুর মতো দরদাম করার প্রচলন আছে। ছেলের পক্ষের যুক্তি সোনার টুকরা ছেলেকে সব কিছু দিয়ে দিতে হবে আর মেয়ের পক্ষের যুক্তি আমাদের কন্যার দাম এতো কম হয় কি করে ! নিজেদের আত্মমর্যাদার জলাঞ্জলি দিয়ে অবশেষে দুপক্ষই চড়া দাম হাকাতে থাকে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় বেশিরভাগ সময় অপেক্ষাকৃত তরুণরাই প্রথম প্রতিবাদী হয় প্রথা ভাঙ্গে। কিন্তু সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হচ্ছে আধুনিক শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরাও সমাজের প্রচলিত এই ধারার বিরুদ্ধাচারণ করে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বরং ক্লীব ও অসহায়ের মতো নির্বাক-নিস্ক্রিয় হয়ে থাকে।

বিয়ে একটি সামাজিক ও ধর্মীয় চুক্তি, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া আর ভালোবাসা। বিয়ে কেবল দুটি হৃদয়ের সম্মিলন নয়, পুরো দুটি পরিবারের মাঝে সেতু বন্ধন। সেখানে প্রথমেই যদি যৌতুক কিংবা দেনমোহর নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়, এই অহেতুক চাপ তাঁদের পরবর্তী জীবনকেও প্রভাবিত করে। সুখী হতে দেয় না। তখন বিয়ের মূল উদ্দেশ্যটাই বাধাগ্রস্ত হয়ে কেঁদে ফিরে।

যেখানে দেশে এখনো মেয়ের বাড়ি থেকে কোরবানির গরু দিতে হয়। কোটি টাকার কাবিন হয়। কনের বাড়িতে আসবাব না থাক, বরের ঘর সাজিয়ে দিতে হয়। এমনকি বরকে গাড়িও দিতে হয়। সামাজিকতার নামে এসব অনাচার পালন করতে গিয়ে জীবন একজনেরই অভিশপ্ত হয়ে ওঠে না, পরিবার সমাজও অভিশপ্ত হয়ে ওঠে। কখনো সখনো হত্যা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। সামর্থবানদের কাছে যেটি সংস্কৃতি, আভিজাত্য; সামর্থ্হীনদের সেটি বহন করতে গিয়ে জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ।

দেশে যৌতুক বিরোধী আইন আছে , কিন্তু সেই আইনের প্রচার ও প্রয়োগ নেই। তাই সমাজপতিদের প্রচলিত অঘোষিত যৌতুক যা একেক এলাকায় একেকরকম কালচার বলে চালিয়ে নেয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতার মাধ্যমে গণজাগরণ ঘটাতে হবে মানুষকে নিয়েই, সরকারকেও কঠোর হতে হবে। যারা এই অন্যায্য ও অবৈধ লেনদেন করেন তাদেরকে নিরুৎসাহিত করতে সবাইকেই যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। আঙ্গুল তুলে বলতে হবে যারা নেন তারা ভিখিরি,যারা দেন তারা ব্যক্তিত্বহীন। বলতে হবে এটা ঘৃন্য অপরাধ। সরকারকেও যৌতুক প্রথার যে ক্যনসার তার বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যেতে হবে, প্রয়োজনে বিয়ে বাড়িতে মোবাইল কোর্ট পাঠাতে হবে।

যৌতুকের বিরুদ্ধে সবসময় বলে এসেছি, এবার দেনমোহর নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে । যৌতুকের বিরুদ্ধে যেমন আইন আছে পিতা-মাতা সহ পাত্রকে আইনের আওতায় আনা যায়, দেনমোহরের বিরুদ্ধেও আইন তথা শাস্তির বিধান থাকা দরকার। যাতে করে প্রয়োজনে কন্যার পিতা-মাতাদের যথোপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনা যায়।

আধুনিক নব দম্পতিকে বলবো, ঘোষণা দিয়ে যৌতুক এবং অতিরিক্ত দেনমোহর দুটোকেই ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করুন ।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টঃ WebNewsDesign