‘যারা আমাকে ঠকায়, তাদের ঘরে কী মা নেই’

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০ | ১১:২১ অপরাহ্ণ | 353 বার

‘যারা আমাকে ঠকায়, তাদের ঘরে কী মা নেই’
নকল এক হাজার টাকার নোট বাম হাতে গোপনা কুন্ডু তার দোকানে বসে কাঁদছেন
Advertisements

সত্তর বছর ছুঁই ছুঁই গোপনা কুন্ডু। যে বয়সে তার বাড়িতে বসে বিশ্রাম নেয়ার কথা, সেই বয়সে তিনি রোজ সকালে উপার্জনের আশায় বের হন। তবে ভিক্ষা নয়, রাস্তার পাশে ফুটপাতের ওপর দু’টো টিন দিয়ে কোন মতে ছাপড়া করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করেন তিনি।

যেটুকু আয় হয় তাই দিয়ে অভাবী ছেলেদের সংসারে বটবৃক্ষের মতো হাল ধরে আছেন। বার্ধক্য দমাতে পারেনি এই বৃদ্ধাকে। দীর্ঘ প্রায় একযুগ ধরে এই পেশায় রয়েছেন তিনি।

তবে সন্ধ্যা নামলেই গোপনা কুন্ডু আতঙ্কে থাকেন। কারণ ফুটপাতের দোকানে নেই বৈদ্যুতিক সংযোগ! কুপি বাতি জ্বালিয়ে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করেন তিনি। চোখেও কম দেখেন। এরই ফাঁকে প্রায়শই কিছু অসাধু ক্রেতা ১০০-৫০০ ও ১০০০ হাজার টাকার জাল নোট দিয়ে প্রায়শই সিগারেট কিনে থাকেন।

যখন এমন ফাঁকির ঘটনা ঘটে, তখন কান্নাকাটি করে সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার চেয়ে বাড়ি ফেরেন। এতে দিনে দিনে পুঁজি কমে গেলেও গেছে হাল ছাড়েননি পাবনার চাটমোহর পৌর শহরের দোলবেদীতলা এলাকার মৃত কালা চাঁদ কুন্ডুর স্ত্রী গোপনা কুন্ডু।

মঙ্গলবার রাত ১০টা। বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্ততি নিচ্ছিলেন গোপনা কুন্ডু। এ সময় এক ক্রেতা এসে ১ হাজার একটি নোট দিয়ে গোল্ডলীফ সিগারেট নেন এক প্যাকেট।

দুইশ’ টাকা দাম রেখে বাকি ৮০০ টাকা ওই ক্রেতাকে ফেরৎ দেন গোপনা কুন্ডু। ওই ক্রেতা চলে যাওয়ার পর পাশের এক দোকানীকে দেখালে নোট টাকা জাল বলে জানানোর পর ডুকরে কেঁদে ওঠেন বৃদ্ধা গোপনা কুন্ডু। প্রতিবারের মতো এবারও সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার চেয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।

এই প্রতিবেদককে গোপনা কুন্ডু জানান, বছর দুই আগে মারা যান স্বামী কালাচাঁদ কুন্ডু। বড় ছেলে উদয় মিষ্টির দোকানের কর্মচারী। ছোট ছেলে থানা মোড়ে ফুটপাতের ওপর পান-বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করেন। ছেলেরা যা উপার্জন করেন তা দিয়ে চলে না সংসার।

নিকট আত্মাীয়রা কোটিপতি ব্যবসায়ী হলেও খোঁজ রাখেন না! তাই বাধ্য হয়ে প্রায় এক যুগ আগে ধার করে এবং জমানো প্রায় ৭ হাজার টাকা দিয়ে দোলবেদীতলা মোড়ে ফুটপাতের ওপর বিড়ি-সিগারেট বিক্রি শুরু করেন গোপনা কুন্ডু। ব্যবসার পুঁজিও বাড়তে থাকে।

এদিকে সংসারের দুরবস্থা দেখে স্থানীয় কাউন্সিলর একটি বিধবা ভাতার কার্ড করে দেন গোপনা কুন্ডুকে। ভাতার টাকা ও ব্যবসার লাভ দিয়ে কোনোমতে চলে সংসার।

কিন্তু মাঝে মধ্যেই এমন অসাধু ক্রেতাদের পাল্লায় পড়ে এখন তার পুঁজি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার টাকায়! একটি ছোট্ট ভাঙ্গাচোরা টিনের বাক্সে কয়েক প্যাকেট বিড়ি-সিগারেট তার ব্যবসার মূলধন। এটা হারানোর ভয়ে সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কে থাকেন এই সংগ্রামী বৃদ্ধা।

গোপনা কুন্ডু কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমার ভাগ্যে বারে বারে কেন এমন হয়? যারা আমাকে ঠকিয়ে যায়, তাদের ঘরে কী মা নেই? আমি তো ভিক্ষা করি না, পরিশ্রম করে সংসার চালাই। আমার পুঁজি শেষ হলে খাবো কী?’

প্রতিবেশী দোকানদার রনি রায়  বলেন, দুই ছেলের অভাবের সংসারে বৃদ্ধ মা বটবৃক্ষের ছাঁয়ার মতো আগলে রাখেন। একজন বৃদ্ধা সৎ পথে আয় করে খাবে সেই পথও আমরা রুদ্ধ করে দিচ্ছি। তাঁর কান্না শুনে খুব কষ্ট লাগে। তবে তাকে একটি স্থায়ী দোকান এবং আর্থিক সহযোগিতা দিলে উপকৃত হতো অভাবী পরিবারটি।

কাউন্সিলর নূর-ই হাসান খান ময়না  বলেন, গোপনা কুন্ডুর সংসারের দুরবস্থা দেখে আমি একটি ভাতার কার্ড করে দিয়েছি। সত্যিই তিনি একজন সংগ্রামী নারী। আসলে আমাদের বিবেক বলে কিছু নেই। দিন দিন মানুষ থেকে আমরা অমানুষে পরিণত হচ্ছি!

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh