মাছের রাজধানী চলনবিলে দেশী মাছের সংকট

সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮ | ৭:৪৪ অপরাহ্ণ | 805 বার

মাছের রাজধানী চলনবিলে দেশী মাছের সংকট
বাজারে শুধু পুকুরের চাষের মাছ।
Advertisements

মাছের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চলনবিল অঞ্চলে এখন দেশী মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভরা বর্ষা মৌসুমেও দেখা মিলছেনা ছোট-বড় দেশী মাছের। নির্বিচার পোনা নিধন আর দখল দূষণে বিচরণক্ষেত্র হ্রাস হওয়ার কারণেই মাছশূন্য হয়ে পড়ছে উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ মৎসভান্ডার চলনবিল।

এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে বিলের উপর নির্ভরশীল সহস্রাধিক জেলে পরিবার। মৎস সম্পদ রক্ষায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলা ও প্রশাসনিক নজরদারী বাড়ানোর দাবী করেছেন পরিবেশবিদরা।

সুস্বাদু দেশীয় মাছের প্রাচুর্যতার কারণে একসময় চলনবিলের সুখ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। একসময় চলনবিলের মাছের অপেক্ষায় থেকেছে কলকাতার বাঙালীরাও। অবিভক্ত বাংলায় চলনবিল থেকে ট্রেন বোঝাই করে মাছ যেত কলকাতায়। অথচ সেই চলনবিল এখন মাছশূন্য। এ যেন এক অভাবনীয় বাস্তবতা।

মৎস বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ বছরে চলনবিলের মাছের উৎপাদন কমেছে ৬৩ শতাংশ। গাঙচিংড়ি, খরশলা, লেটুকি, বাঁশপাতা, ফাতাশি, নান্দিনা, বউ, ভাঙ্গন, ঘোড়া, মহাশোল, তিলাশোল, রেনুয়াসহ অসংখ্য মাছের নাম উঠেছে বিলুপ্তির খাতায়। বিলপ্তির পথে দেশী কৈ, মাগুর,ভেদাসহ বিভিন্ন প্রজাতি। ভরা মৌসুমে মিলছে না মাছ। চরম দুর্দশায় দিন কাটছে বংশ পরম্পরায় মাছ ধরে আসা জেলে পরিবারগুলোর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত শতকের আশির দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত ¯øুইচ গেট ও বাঁধে, শুরু হয় চলনবিলের মরুকরণ। কমে যায় গভীরতা। পলি পড়ে ভরাট হয় জলাভূমি।এতে কমে যায় মাছের বিচরণক্ষেত্র, স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় বাধাগ্রস্থ হয় প্রজনন। কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় অস্তিত্ব হারায় দেশী মাছের বিভিন্ন প্রজাতি।

শুষ্ক মৌসুমে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অবৈধ সোঁতি, কারেন্ট ও বাদাই জাল দিয়ে চলে ডিমওয়ালা মাছ নিধন। প্রাকৃতিক জলাধার সেচে মাছ ধরা নিষিদ্ধ হলেও তা মানছে না কেউ। মানুষের নির্মম লালসায় মারা পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছ। এ প্রসঙ্গে কথা হল পাবনার চাটমোহর উপজেলার চিনাভাতকুর হালদার পাড়া গ্রামের কয়েকটি মৎসজীবী পরিবারের সঙ্গে। মাছের অভাবে প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়া এ পরিবারগুলোর কন্ঠে কেবল পূর্বপূরুষের পেশা টিকিয়ে রাখার আকুতি।

বয়সের কোঠায় সত্তর পেরোনো মৎসজীবী নিতাই হালদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘ আগে এক খ্যাও জাল ফেলায়া যে মাছ মারিছি, তা সারাদিন ধইরেও বেচি শ্যাষ করবের পারিনি। আর এহন দিনভর খ্যাও দিয়েও এককেজি মাছ পাওয়াই কঠিন ’।

মৎসজীবী সন্তোষ হালদার বলেন, ‘ আগে চলনবিলে সারা বছর পানি থাকত। বাঁধ, ¯øুইচগেট তৈরী করে বিলে পানি ঢোকা বন্ধ করা হয়েছে। দিনে দিনে বিল শুকিয়ে ভরাট হয়েছে মাছ থাকবে কোথায়? এর পাশাপাশি বিলের জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগে যেটুকু মাছ ছিল তাও টিকে থাকতে পারছে না। এখন বিলের মাঝে অনেকে হাইব্রীড মাছের চাষ করে চলনবিলের মাছ হিসেবে বিক্রি করলেও, চলনবিলের নিজস্ব দেশীয় মাছ পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে।

মাছ না পেয়ে নিদারূন অর্থকষ্টে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা। হালদার পাড়া জেলে পল্লীর তুষার হালদার জানালেন সে কথা। তিনি বলেন, চৌদ্দ পুরুষের পেশা পরিবর্তন করতে কখনোই মনে সায় দেয়নি। কিন্তু নিতান্তই বাধ্য হয়ে এ পেশা ছেড়ে ঢাকায় চাকুরী নিয়েছেন তিনি।
মৎস সম্পদ কমে যাওয়ার পেছনে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও চাষাবাদে যথেচ্ছ রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারকে দায়ী করেছে স্থানীয় মৎসবিভাগ।

চাটমোহর উপজেলা সিনিয়র মৎস কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, চলনবিলকে ক্ষতবিক্ষত করে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনার কারণে চলনবিল খন্ডিত হয়েছে, পলি পড়ে ভরাট হয়ে কমেছে আয়তন। এর পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক চলন বা প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হওয়ায়, এর সাথে যেসব মাছের প্রজনন সম্পর্ক রয়েছে, তার অনেকটাই আজ বিলুপ্ত। এছাড়া চাষাবাদে যথেচ্ছ রাসায়নিক কীটনাশক দেশী মাছের প্রজাতি ধ্বংসের একটা বড় কারণ। এরপরও , মৎসবিভাগ অভয়াশ্রম করে দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষায় কাজ করছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, উন্নয়নের নামে পরিবেশের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ আর তথাকথিত কৃষি বিপ্লবের রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রতিক্রিয়ায় গত ৩০ বছরে হারিয়ে গেছে চলনবিলের অন্তত ৪০ প্রজাতির দেশীয় মাছ। অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে আরো বিভিন্ন প্রজাতি। এখন উদ্যোগ না নিলে প্রাকৃতিক এ মৎস ভান্ডার অচিরেই হয়ে পড়বে মাছশূন্য ।

মৎস সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পরামর্শ পরিবেশবিদদের।

এ প্রসঙ্গে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোঃ নাজমুল ইসলাম বলেন, চলনবিল কেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের কুফল হিসেবে এ বিলের জীববৈচিত্র্য ও মৎস সম্পদ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বিলনির্ভর বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকায়। এ ছাড়া মানুষের নির্মম লালসা কারণে অভয়াশ্রম থেকেও মাছ ধরে নেয়া হচ্ছে। কাজেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ও সচেতনতা ছাড়া কোনভাবেই মৎস সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নির্ভর সংরক্ষণ (কমিউনিটি বেসড প্রিসারভেশন) পদ্ধতির প্রয়োগ করা যেতে পারে।

খোঁজখবর/এসআর

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh