পাবনায় হাজির আসল চিকিৎসক

ভাঙ্গুড়ায় ভুয়া চিকিৎসক নিয়ে তোলপাড়

শনিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০১৯ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ | 1234 বার

ভাঙ্গুড়ায় ভুয়া চিকিৎসক নিয়ে তোলপাড়
Advertisements

অন্য একজন চিকিৎসকের নাম, সনদপত্র, এমনকি বিএমডিসি’র (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) নিবন্ধন নম্বর জালকারী এক ভুয়া চিকিৎসকের সন্ধান মিলেছে পাবনার ভাঙ্গুড়ার শরৎনগর বাজারে।

ঢাকার স্বনামধন্য চিকিৎসক ডা. মাসুদ করিমের নাম ব্যবহার করে ওই কথিত চিকিৎসক ১ লাখ ১০ হাজার বেতনে চাকুরী করতেন ‘ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড’ নামক একটি ক্লিনিকে। সাত বছর পর এসে প্রমাণ মিললো তার ভুয়া চিকিৎসকের বিষয়টি।

খবর পেয়ে পাবনায় হাজির প্রকৃত চিকিৎসক ডা. মাসুদ করিম। এনিয়ে তোলপাড় শুরু হলে গা ঢাকা দিয়েছেন ওই কথিত চিকিৎসক।
ঘটনার শুরু ৭ বছর আগে ২০১২ সালে। পাবনার ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ারে আলট্রাসনোলজিষ্ট ও আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন ‘কথিত চিকিৎসক’ ডা. মাসুদ করিম। প্রতি মাসে এক লাখ ১০ হাজার টাকা বেতন নেন তিনি।

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) পাবনা জেলা শাখার আজীবন সদস্য হিসেবে তার পরিচিতি ছিল সবার সাথে। কিন্তু কেউ ঘুনাক্ষরেও জানতে পারেনি, তিনি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে চিকিৎসক সেজে আছেন। সাত বছর পর এসে জানা গেলো তিনি আসল ডাক্তার মাসুদ করিম নন।

তিনি ঢাকার স্বানমধন্য একজন চিকিৎসক ডা. মাসুদ করিমের নাম ও সকল সনদ জাল করে, এমনকি তার বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)’র নিবন্ধন নম্বর ৩৩৩৬০ ব্যবহার করে ‘চিকিৎসক’ সেজে কাজ করেছেন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন প্রকৃত মাসুদ করিমের বন্ধু আরেক বিশিষ্ট ও স্বনামধন্য চক্ষু সার্জন মাহবুব উল কাদির। সেখানে তিনি ভুয়া ও প্রকৃত চিকিৎসকের ছবি দিয়ে উল্লেখ করেন, ‘ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার ক্লিনিকে বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বার ৩৩৩৬০ ব্যবহার করে যিনি চিকিৎসা দিচ্ছেন তিনি ভুয়া ডাক্তার। ঢাকার একটি ক্লিনিকে কর্মরত চিকিৎসক প্রকৃত মাসুদ করিমের নাম-পরিচয় ও নিবন্ধন নাম্বার ব্যবহার করে তিনি প্রতারণা করছেন। ঘটনা জানাজানির পর শুরু হয় তোলপাড়।

বৃহস্পতিবার (২৪ জানুয়ারি) ভাঙ্গুড়া উপজেলার শরৎনগর বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিকের সামনে লোকজনের আনাগোনা। ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন হাতে গোনা কয়েকজন। ক্লিনিকের সামনে বুধবার রাতে ভুয়া ডাক্তার মাসুদ করিমের যে সাইনবোর্ড ছিল সেটা আর নেই। খুলে ফেলেছে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। সন্ধান করে পাওয়া গেলোনা ভুয়া ডাক্তারকে। তিনতলার একটি কক্ষে ঢাকা থেকে আসা প্রকৃত চিকিৎসক ডা. মাসুদ করিম ক্লিনিকের পরিচালক আব্দুল জব্বারের সাথে কথা বলছেন।

ভুয়া চিকিৎসক মাসুদ করিমের সাইনবোর্ড খুলে ফেলেছে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ

ভুয়া চিকিৎসক মাসুদ করিমের সাইনবোর্ড খুলে ফেলেছে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ

আলাপকালে প্রকৃত চিকিৎসক ডা. মাসুদ করিম বলেন, ১৯৯০-৯১ সেশনে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ঢাকার খিলগাঁওয়ে নিজস্ব ডক্টরস চেম্বারে প্রাইভেট চিকিৎসা দেন। স্থায়ী ঠিকানা ফেনীর সোনাগাজী। বাবার নাম আব্দুস শাকুর। বন্ধু চিকিৎসকদের মাধ্যমে জানতে পেরে বৃহস্পতিবার পাবনায় ছুটে এসেছি। আমার নাম-পরিচয় ও নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একজন চিকিৎসক সেজে কাজ করছেন, বিষয়টি আমার জন্য খুব অপমানজক। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখায় মৌখিক আমি জানিয়েছি এবং পাবনা সিভিল সার্জনকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এ বিষয়ে তিনি প্রতারক ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলেও জানান।

ভুয়া ডাক্তারের বিষয়ে কথা হয় স্থানীয়দের সাথে। তারা জানান, ইতিপুর্বে ভুয়া মাসুদ করিমের ভুল চিকিৎসায় কয়েকজন মারা গেছে। ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ এ দায় এড়াতে পারেন না। কারণ বাড়ি ভাড়া নিতে গেলেও জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি সহ অনেক কিছু দিতে হয়। সেখানে একটি ক্লিনিকে এক লাখ টাকার উপরে বেতন দিয়ে একজন চিকিৎসক রাখবেন তারা তাকে ও তার কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে দেখবে না?

কয়েকজন বলেন, ভুয়া ডাক্তার কাগজপত্র জাল করলো কিভাবে? নিশ্চয়ই কেউ তাকে সহযোগিতা করেছে। তাদের খুঁজে বের করা দরকার।সবার দাবি, অতি দ্রæত ভুয়া চিকিৎসককে খুঁজে বের করে তার আসল পরিচয় উদঘাটন করা হোক।

ঘটনা জানাজানির পর ভাঙ্গুড়া থেকে গা ঢাকা দেন ভুয়া চিকিৎসক। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চেয়ে কথিত চিকিৎসক মাসুদ করিমের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ১৯৯২-৯৩ সেশনে ভর্তি হয়েছিলাম। আমি ঢাকায় বিএমডিসিতে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে নুতুন করে কাগজপত্র ঠিক করে নিয়ে আসতে বলেছে। আমি মংমনসিংহ মেডিকেল কলেজে যাচ্ছি।’

তিনি আরো জানান, আমার পৈত্রিক বাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায়। তবে রংপুরের শালবন এলাকায় স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন। তার বাবার নাম আবদুস শাকুর। অথচ ক্লিনিকের পরিচালকদের সাথে ২০১২ সালের চুক্তিনামায় তিনি তার ঠিকানা নীলফামারীর ডিমলা বাবুরহাট উল্লেখ করেছেন।

অভিযুক্ত মাসুদ করিমের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড ক্লিনিকের পরিচালক আবদুল জব্বার জানান, ‘মাসুদ করিমকে মাসিক এক লাখ ১০ হাজার টাকা বেতনে আমাদের ক্লিনিকে চাকুরী করেন। তিনি পাবনা জেলা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) আজীবন সদস্য। পাবনার বিভিন্ন ক্লিনিকে দীর্ঘদিন চাকুরী করেছেন। আমাদের কাছে তার সনদের ফটোকপি জমা দিয়েছিলেন। কখনও মনে হয়নি যে তার কাগজপত্র জাল। তবে এখন শুনছি তিনি ভুয়া চিকিৎসক। রাতের আঁধারে ডা. মাসুদ করিম নামের সাইনবোর্ড খুলে ফেলছেন কেন জানতে চাইলে কোনো সদুত্তোর দিতে পারেননি তিনি।’

অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি নজরে আসার পররপই ব্যবস্থা নিলে গ্রেপ্তার করা যেতো কথিত চিকিৎসককে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে কালক্ষেপন করেছেন।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হালিমা খানম জানান, ঘটনা জানার পরপরই আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। সত্যতা যাচাই করেছি। কাগজপত্র আনার কথা বলে পালিয়েছে কথিত ভুয়া ওই মাসুদ। প্রকৃত মাসুদ করিম স্বশরীরে আমার কাছে এসে অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি সিভিল সার্জন স্যার, ইউএনও ও বিএমডিসি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ’র উচিত ছিল কাউকে নিয়োগ দেয়া বা চুক্তি করার আগে তার কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে দেখা।’

এ প্রসঙ্গে পাবনা সিভিল সার্জন ডা. তাহাজ্জেল হোসেনের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি রাগত্ব স্বরে বলেন, প্রতিদিন ৮/১০ জন করে সাংবাদিক ফোন দিচ্ছে। আপনারা টিএইচও ডা. হালিমা’র সাথে কথা বলুন। তাকে সব বলা আছে। যেহেতু সে পলাতক, সেহেতু আমাদের কিছু করার নেই। সে পাবনায় আসলে তাকে ধরা হবে।

ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ারসহ পাবনার অন্যান্য ক্লিনিকে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের শিক্ষাসনদসহ অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই বাছাই করার দাবি সচেতন সমাজের।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh