বাংলাদেশি পাসপোর্টে প্রথম শততম দেশভ্রমণ করলেন আসমা আজমেরী

রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৫:১০ অপরাহ্ণ | 2542 বার

বাংলাদেশি পাসপোর্টে প্রথম শততম দেশভ্রমণ করলেন আসমা আজমেরী
কাজী আসমা আজমেরী
Advertisements

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সবুজ রঙের পাসপোর্ট নিয়ে ১০ বছর ধরে শততম দেশ ভ্রমণের ইতিহাস গড়লেন কাজী আসমা আজমেরী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঘুরে (গত ২৯ শে অক্টোবর ২০১৮) উজবেকিস্তান সীমান্ত থেকে দাশোগুজ দিয়ে তুর্কিমেনিস্তানে পৌঁছে শততম দেশে পা রাখেন তিনি। শততম দেশ ভ্রমণ করার আনন্দ-উল্লাস বয়ে চলছে তার দেহ-মন জুড়ে।

কাজী আসমা আজমেরীর কাছে শততম দেশভ্রমণ করার অনুভ‚তির কথা জানতে চাইলে উচ্ছসিত হয়ে তিনি বললেন, ‘১০০ তম দেশভ্রমণ আমার স্বপ্ন ছিল। আজ স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আমি খুব খুব আনন্দিত। বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে দেশ ঘুরেছে অনেকেই, তার মধ্যে কেউ ফ্ল্যাগ বয় ফ্ল্যাগ গার্ল উপাধি পেয়েছেন। আমি কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে ১০০টি দেশ ভ্রমণ করলাম। আমার শততম দেশ ভ্রমণ তুর্কিমিনিস্তানের স্ট্যাম্প দিয়ে পূরণ করলাম। এটা আমার জন্য গৌরবের বিষয়।’

‘২৯ শে অক্টোবর স্মরণীয় একটা দিন। এই দিনটির জন্য দীর্ঘ দশ বছর ধরে লালন করেছি। বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ আমার জন্য প্রায়ই অসম্ভব ছিল। কিন্তু আমিও কম নাছোড়বান্দা নই, অসম্ভবকে সম্ভব করে আমার স্বপ্ন পূরণের দারপ্রান্তে পৌঁছেছি। সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ মা-বাবার প্রতি ও যাদের সহযোগিতা আমার শততম দেশ ভ্রমণ ‘

তিনি বলেন, আমার এ জয় শুধু আমার নয়, ‘আমি মনে করি এটা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের জয়। আমি পেরেছি বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্বের ১০০ দেশে পৌঁছে দিতে। প্রতিটি দেশে বাংলাদেশের ছাপ রেখে এসেছে। আমার এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে, আমি চাই বিশ্বের প্রতিটি দেশে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে।’
Kazi Asma Azmery Pic-05

কাজী আসমা আজমেরী ২০০৮ সালে থেকে দেশ ভ্রমণ শুরু করেন। দেশ ভ্রমণ কিভাবে শুরু হলো জানতে চাইলে কাজী আসমা আজমেরী বলেন, ‘ছোটবেলায় মায়ের সাথে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। একদিন স্কুল ছুটির পর তার মা নিতে এলেন না। অবশেষে আমি একাই সাহস করে বাসার উদ্দেশে হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটছি আর তাকিয়ে দেখছি আকাশটাকে। আকাশ দেখে মনে হলো, আকাশের শেষ সীমানা দেখব। কিন্তু আকাশের শেষ সীমানা আর দেখা মেলে না। সেদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হেঁটেছিলাম। পরে খুলনা কাজী বাড়ি ছোট্ট মেয়েকে দেখে এলাকাবাসী আমাকে ধরে নিয়ে বাসায় পৌঁছে দেন। তারপর থেকে দেশ ভ্রমণ করার ইচ্ছাটা লালন করি। আকাশের সীমানা খুঁজে চলেছি।’

‘যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন আমার এক বন্ধুর মা আমাকে বলেছিলেন, তুমি একজন দুর্বল ও যোগ্যতাহীন মেয়ে। আমার ছেলে ২০ দেশ ঘুরেছে। আর তুমি মাত্র দুটো দেশ ঘুরেছো। এতেই তোমার অংহকার। বন্ধু মায়ের কথাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। আমিও দেশ ভ্রমণ করে দেখিয়ে দেব। কমপক্ষে হলো ৫০টি দেশ ঘুরব। ৫০টি দেশ ভ্রমণ করে থেমে থাকিনি। আমি ঘুরছি। আজ আমি শততম দেশ ভ্রমণ করে ফেলেছি। ইচ্ছা আছে পৃথিবীর সব দেশ ভ্রমণ করব।’
Kazi Asma Azmery Pic-02

কাজী আসমা আজমেরী বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের কত না ঘটনা কত না স্মৃতি তার ঝুলিতে। কখন আনন্দের কখন বেদনার। কিছু কিছু দেশে গিয়ে তার অনেক ভোগান্তি হয়েছে, বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকে ঘুরে ঘুরে দেখার ঐকান্তিক সাধনায় তিনি পিছিয়ে পড়েননি। ২০০৯ সালে ভিয়েতনাম ভ্রমণে গিয়ে ফিরতি টিকিট না থাকায় তাকে ২৩ ঘণ্টা জেলে আটকিয়ে রাখা হয়। তারপর ২০১৪ সালে ব্রাজিল ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে মানিব্যাগসহ ব্যাংকের কার্ড অনেকে কিছু চুরি হয়ে গিয়েছিল। তখন বেশ কয়েকদিন টাকার অভাবে খাওয়ার কষ্ট হয়েছিল তার।

আসমা ছোটবেলা থেকেই খেতে খুব পছন্দ করেন। দেশে ভ্রমণে তিনি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিয়ত প্রায় নতুন নতুন খাবার খান। অদ্ভুত রকমে খাবারগুলো বেশি খেয়ে থাকেন। এর মধ্যে তিনি জানান, জর্জিয়ার কিংকালি তার প্রিয় খাবারের একটি। এ ছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল খাবারের মধ্যে একটি চায়নার অ্যাবালন ফুড। ভারতের জয়পুরের ফালাক। অট্রোলিয়ার পর্ন কোকটেন।

কাজী আসমা আজমেরীকে তার বাবা বলেছিলেন, যে দেশে যাবে, সে দেশে গিয়ে আগে জাতীয় জাদুঘর দেখবে। আসমা তাই করেন। যে দেশে যান, সে দেশে প্রথমেই জাদুঘর দেখেন। জাদুঘর দেখলে তিনি সে দেশের সংস্কৃতি সম্পর্ক ধারণা পেয়ে যান। ভালো লেগেছে শিকাগোর ফিল্ডং জাদুঘর। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জাদুঘর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ হারমিটেজ। সেখানে গিয়ে তিন বন্ধু একসাথে ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। তার সাথে ছিল অস্ট্রেলিয়ার বন্ধু মার্ক ও সুইডেন্টের বন্ধু টয়।

কাজী আসমা মিশরীয় পিরামিড থেকে শুরু করে মরক্কোর ইবনে বতুতার বাড়ি, বার্লির সেভেন উন্টার গ্রেট ওয়ান। ফ্রান্সের প্যারিস শহরে আইফেল টাওয়ার। স্ট্যাট অব লিবার্টিসহ বিভিন্ন দেশের ভাস্কর্য দেখেছেন। তার ছবির অ্যালব্যামে রয়েছে। কাজী আসমা আজমেরী কয়েক বছর ধরে নিউজিল্যান্ডের রেড ক্রসে কাজ করেছেন। তিনি একজন রোটারিয়ানও। সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে জড়িত রেখেছেন।
Kazi Asma Azmery Pic-04

কাজী আসমা আজমেরী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মিডিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর ২০১৮ সালে বিবিসি বাংলা প্রত্যুষা অনুষ্ঠানে তার সাক্ষাৎকার প্রচার হয়। ২০১৫ সালে ভয়েস অফ আমেরিকার চোখে পড়েন আসমা। ভয়েস অব আমেরিকার আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন ডিসিতে তিনি একটি সাক্ষাৎকার দেন। এরপর ২০১৫-২০১৬ সালে বিভিন্ন বাংলাদেশি টিভিতে অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বলেছেন তার ভ্রমণ কার কথা। এছাড়াও চায়না রেডিও ও বেতার বাংলা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশি পর্যটক হিসেবে। উজবেকিস্তানের মাইটিভি এবং তুর্কেমেনিস্তানের ন্যাশনাল নিউজ পেপার তুর্কিস্তানে তার ১০০টি দেশে পদার্পণের সংবাদ প্রকাশিত হয়।

কাজী আসমা আজমেরী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি অ্যাম্বাসির আমন্ত্রণে গিয়েছেন। সর্বশেষ তিনি গত ২৪ অক্টোবর ২০১৮ সালে ৯৯ দেশ ভ্রমণ হিসেবে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে বাংলাদেশ অ্যাম্বেসিতে উদযাপন করেন। সেখানে তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা সবার সামনে তুলে ধরেন। এছাড়াও বাংলাদেশের সফলতার দেশ হিসেবে তিনি অতিথি বক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। উদযাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উজবেকিস্তানে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর এক্সট্রাঅর্ডিনারি মাসুদ মান্নান। ভারতের অ্যাম্বাসেডর, বুলগেরিয়ার অ্যাম্বাসেডর, আলবেনিয়া অ্যাম্বাসেডর, জর্জিয়ার অ্যাম্বাসেডর, জর্ডানের অ্যাম্বাসেডারসহ অনেকে। তিনি উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে অবস্থান করছেন। খুব শিগগির বাংলাদেশে আসবেন।

আসমা জন্মগ্রহণ করেন খুলনার বিখ্যাত কাজী পরিবারে। বড় হয়েছেন খুলনা শহরে। তার বাবার নাম কাজী গোলাম কিবরিয়া। মায়ের নাম কাজী সাহিদা আহমেদ। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে কাজী আসমা আজমেরী।

আসমা বড় ইকবালনগর গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। তারপর খুলনা মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে (বিবিএ) মার্কেটিং-এ স্নাতক করেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে একই বিষয়ে এমবিএ করেন।
Kazi Asma Azmery Pic-03

কাজী আসমা আজমেরী দেশে ফিরে ১০০টি দেশ ভ্রমণ শেষে নিজের অভিজ্ঞতার কথা গণমাধ্যমে বর্ণনা করবেন। এছাড়া মানবিক দিকে বিবেচনা করে দেশে ফিরে তিনি একটি চক্ষু হাসপাতাল, একটি ডেন্টাল হাসপাতাল ও একটি ট্রেনিং সেন্টার এবং একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার হাত দেবেন। পাশাপাশি দুস্থ অসহায় মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আজীবন তাদের পাশে থাকতে চান বাংলাদেশের ইবনে বতুতা খ্যাত কাজী আসমা আজমেরী।

এছাড়াও ভিসা জটিলতা আর বিভিন্ন এক্সপেরিয়েন্স থেকে তিনি চিন্তা করেছেন যে, গড়ে তুলতে চান বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া এবং হেল্পলাইন সেন্টার যাতে কোনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট হোল্ডার কোথাও সমস্যার মুখোমুখি হলে তিনি সহায়তা করতে পারেন। বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে কারও যেন ভোগান্তিতে না পড়তে হয়। বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখে যেন বিদেশীরা সম্মান করেন এবং আসমাকে দেখে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে অনেক যেন ভ্রমণ করতে উৎসাহিত হয়।

জয় হোক আসমার, জয় হোক বাংলাদেশের, জয় হোক বাংলাদেশের পাসপোর্টের।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh