অবৈধ দখল থেকে উদ্ধারের দাবি

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত বাড়িটি অন্যের দখলে !

সোমবার, ২৭ আগস্ট ২০১৮ | ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ | 1002 বার

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত বাড়িটি অন্যের দখলে !
বঙ্গবন্ধুর সাথে পাবনার হোসেন খান
Advertisements

পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হোসেন খান ছিলেন শহরের প্রতিষ্ঠিত একজন হোসিয়ারী ব্যবসায়ী। ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর। রাজধানীর পুরানা পল্টনে ছিল তাদের দু’টি বাড়ি। যার একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় আওয়ামী লীগের অফিস হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সেই স্মৃতি বিজরিত বাড়িটি আজ অন্যের দখলে। নানাভাবে চেষ্টা করেও বাড়িটি ফিরে পাননি হোসেন খানের সন্তানরা। বাড়িটি অবৈধ দখল থেকে উদ্ধারের দাবি স্বজনদের।

ষাটের দশকে যখন দেশের অন্যান্য স্থানের মত পাবনাতেও প্রকাশ্যে কেউ নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী পরিচয় দিতে সাহত পেতো না সেই সময়ে তিনি পাবনায় আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার দায়িত্ব নেন। দক্ষ এই সংগঠকের দোকানে নিয়মিত বসতেন ডাক সাইটে আওয়ামী লীগার আমজাদ হোসেন এমএনএ, মুক্তিযুদ্ধর অন্যতম সংগঠক অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন, আব্দুর রব বগা মিয়া, আলহাজ্ব আবু তালেব খন্দকার সহ আরো অনেকে।

পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, এই হোসেন খান সাহেবের মা আজিজন নেসার নামে রাজধানী ঢাকার ৫১ ও ৫২ নম্বর পুরানা পল্টনে দু’টি বাড়ী ছিলো। ষাটের দশকের শেষ দিকে রাজধানী ঢাকায় আওয়ামী লীগের অফিস ভাড়া পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এসময় পাবনার এমএনএ আমজাদ হোসেন সহ অন্যরা হোসেন খান সাহেবকে অনুরোধ করেন, তাদের ঢাকার দুটো বাড়ীর মধ্যে যে কোনো একটি আওয়ামী লীগের অফিস হিসাবে ভাড়া দেয়ার জন্য।

তাদের অনুরোধে রাজী হন হোসেন খান। কথা শুরু হয় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু ৫১ নম্বর পুরানা পল্টনের তিনতালা বাড়ীটি আওয়ামী লীগের অফিস হিসাবে ভাড়া নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। জাতির পিতার আগ্রহেই হোসেন খান সাহেব ৫১ নম্বর পুরানা পল্টনের বাড়ীটি আওয়ামী লীগের অফিস হিসাবে ভাড়া দেন।

১৯৬৯ সালের ১ জুন হোসেন খানের বড় ছেলে হাসান কবীর ঢাকার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ীতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সরাসরি দেখা করে ঐ বাড়ীর চাবি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন। এসময় বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে হোসেন খান সাহেবকে চিঠি লিখে বাড়ীর চাবি পাওয়ার কথা জানান। সেই চিঠিতে বঙ্গবন্ধু লিখেন “জনাব হোসেন খান সাহেব। আপনার বাড়ী ভাড়া নেয়ার কথা ছিলো। তার চাবি আপনার ছেলের মারফত আমি পেয়েছি”।

Pabna Bongo Bondhu-Hosain Ali Khan Letter Photo-2

ঐ দিন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত বিমর্ষ। যার প্রমান পাওয়া যায় সেই চিঠিতেও। চিঠির শেষ প্রান্ত্রে বঙ্গবন্ধু লিখেন, “আজ আমার মনের অবস্থা খুব খারাপ। পূর্ব বাংলার খ্যতনামা সম্পাদক ইত্তেফাকের মানিক মিয়া রাওয়ালপিন্ডিতে ইন্তেকাল করেছেন। আপনারা সবাই তার রুহের মাগফেরাত কামনা করবেন”।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ৫১, পুরানা পল্টনের আওয়ামী লীগের অফিস জ্বালিয়ে দেয়। তাদের নারকীয়তায় পুরো বাড়ীটি পুড়ে যায়। এর পর থেকে বাড়ীটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়।

হোসেন খানের ছোট ছেলে ফারুক কবীর খান জানান, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক শহীদ হওয়ার পরে হোসেন খানের এক ভাইয়ের সন্তানরা সেই বাড়ীতে বসবাস শুরু করে। হোসেন খানের ৮ ছেলে ২ মেয়ের সবাই জানতো বাড়ীটি পত্যিক্ত অবস্থাতেই পড়ে আছে। ১৯৮৪ সালে হোসেন খান ইন্তেকাল করার আগ পর্যন্ত তার সন্তানরা ঐ বাড়ীটির বিষয়ে আর কিছুই জানতে পারে নাই।

ফারুক কবীর খান আরো জানান, ২০০৪  সালের দিকে তার বাবা হোসেন খানের ভাইয়ের ছেলেরা ৫১ ও ৫২ পুরানা পল্টনের দু’টো বাড়ীই তাদের পরিবারকে অবহিত না করে মাল্টিষ্টোরড বিল্ডিং করার জন্য ডেভেলপারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। এ খবর জানতে পেরে হোসেন খানের সন্তানরা ঢাকায় গিয়ে কয়েক দফা বাড়ীটিতে তাদের অংশীদারিত্ব আছে বলে জানিয়েও বারবার প্রত্যাখ্যত হয়ে ফিরে আসে।

এসব তথ্য জানিয়ে তিনি জানান, একপর্যায়ে তারা (হোসেন খানের সন্তানেরা) ডেভেলপারের সাথে কথা বললে ডেভেলপার তাদের সাথেও একটি চুক্তিনামা সম্পন্ন করেন। যদিও পরে ডেভেলপার সে চুক্তি রক্ষা করেননি।

বাড়িটি উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন মহলে ধর্ণা দিয়ে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে হোসেন খানের পরিবারের পক্ষ থেকে বড় ছেলে হাসান কবীরখান তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে সবকিছু তাকে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগ্রহ ভরে সমস্যার কথা শুনে তা সমাধানের আশ্বাসও দেন। এরপরে পেরিয়ে গেছে ১০টি বছর। বাড়ীটিতে আজো অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি হোসেন খান সাহেবের সন্তানেরা।

হোসেন খানের ছোট ছেলে ফারুক কবীর খান সহ অন্যরা জানান, শৈশবে তারা দেখেছে বঙ্গবন্ধু পাবনাতে এলে হোসেন খান সাহেবের পাবনার বাড়ীতে আসার চেষ্টা করতেন। হোসেন খানের ছেলেদের সুন্নতে খাতনার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন পাবনার গোপালপুর মহল্লার হোসেন খানের বাড়ীতে। বঙ্গবন্ধুর সাথে হোসেন খানের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো।

‘৭০ এর দশকের পাবনার ডাকসাইটে ছাত্রলীগ নেতা বর্তমানে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আব্দুর রহিম পাকন জানালেন, “সেই সময়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে পাবনার হোসেন খান সাহেবের অনেকটাই পারিবারিক সম্পর্ক ছিলো। বঙ্গবন্ধু পাবনাতে এলে হোসেন খান সাহেবের বাড়ীতে আসতেন। ১৯৬৯ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু পাবনাতে আসেন। সেদিন তিনি দুপুরে লাঞ্চ করেন হোসেন খান সাহেবের বাড়ীতেই।

পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট বেলায়েত আলী বিল্লু জানালেন, প্রবীনদের কাছ থেকে তারা জেনেছেন সেই সময়ে পাবনার হোসেন খান সাহেব বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

গোপালপুর মহল্লার প্রবীন ব্যক্তি রুহুল আমিন ১৯৬৯ সালের স্মৃতি রোমন্থন করে জানালেন, বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষে হোসেন খান সাহেবের বাড়ী সাজানো হয়েছিলো সুন্দর করে। দুপুরের দিকে একটি জীপ আর তার সাথে তিনটি গাড়ীর বহর নিয়ে বঙ্গবন্ধু সফর সঙ্গীদের নিয়ে হোসেন খান সাহেবের বাড়ীতে এসেছিলেন। তিনি ঐ বাড়ীতে অনেক সময় কাটিয়েছেন। নিজের পরিবারের সদস্যদের মত করে তিনি হোসেন খান সাহেবের বাড়ীর লোকজনের খোঁজ খবর নেন।

জাতির পিতার ঘনিষ্ট সহচর পাবনার হোসেন খানের ঢাকার পৈর্তিক বাড়ীটির দখল ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন হোসেন খানের সন্তানেরা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh