পিতৃ স্নেহের কাছে মরনের পরাজয়

রবিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১:২৭ অপরাহ্ণ | 955 বার

পিতৃ স্নেহের কাছে মরনের পরাজয়
Advertisements

গোধূলির লগ্ন ছিলো সেটা। গ্রামে সন্ধ্যার আগে কৃষকেরা গরু নিয়ে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে বাড়ি ফিরতো, দিবস শেষে ক্লান্তি আর ক্ষুধাই হয়তো বাড়ি ফেরার তাড়না বাড়িয়ে দিতো, তাই ‘চল হাট হাট’ হাক দিয়ে কৃষকের থাকতো দ্রুত ফেরার তাড়া। যে তাড়নায় গরুগুলো ছুটতো স্বাভাবিকের চেয়ে একটু জোরে। তাই গরুর দ্রুত পায়ে উড়তো ধূলি। চিরাচায়িত বিকালে গরুর পায়ের এ ধূলির জন্যই সময়ের নাম হয়েছে গোধূলি।

বর্ষা শেষে শরৎএর এ সময়টাও বিল অঞ্চলে পানি জমে আছে ভরাট আর বিগত যৌবনের মাঝামাঝি অবস্থায়। নৌকা ভ্রমনের জন্য সময়টা মন্দ নয়। তাই আপনি যখন বিলের মাঝে নৌকা ভ্রমনে থাকবেন, সন্ধ্যার আগের সময়কে আপনার অন্য নামে ডাকতে হবে। বিলের মাঝে এ সময়টা গরুর পায়ের ধূলির নয় বরং দূর দিগন্তে ডুবতে বসা সূর্যের লালে বিলের জলে রাঙ্গা আভা ছড়ানো এক লগ্ন।

মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে বিকালে, তাই একসময় বিয়ের কনে দেখানো হতো বিকালে। সে কারনে বিকালের রোদকে বলা হয় ‘কনে দেখা রোদ’। জেনে হোক আর না জেনে, কনে দেখা রোদের সবচেয়ে বেশী প্রয়োগ হয় নৌভ্রমনে, বিকাল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্তই নৌভ্রমনে সবচেয়ে বেশী ছবি তোলা হয়।

৩১ আগস্ট’১৮, তেমনি এক ছবি তোলা সন্ধ্যা পরিনত হলো ছবি হয়ে ওঠার গল্পে! ঈশ্বরদী থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে চলনবিলে নৌকা ভ্রমনে এসেছিলো ২২ জনের এক দল। সন্ধ্যার বিলের জলে ডুবতে বসা সূর্যের প্রতিবিম্বে যে মায়াবি আবহ তৈরী হয়, সে সময়ই নৌকার ছৈয়ের ওপরে সবাই তুলছিলো সেলফি। তখনই ছৈ ভেঙ্গে ঘটে নৌকা ডুবির ঘটনা।

পানিতে যখন হাবুডুবু খাচ্ছে ২২ টি জীবন, তখনই তাদের বাঁচাতে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে এগিয়ে আসে নদী পাড়ের এক নারী এবং এক কিশোর। একে একে উদ্ধার করে ১৮ জনকে। সে ১৮ জনের একজন ঈশ্বরদী আমবাগান এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম স্বপন।

নৌকায় উঠেই নিরাপদ স্বপন খেয়াল করে একটু দূরেই হাবুডুবু খাচ্ছে তার ১২ বছর বয়সী মেয়ে সওদা মনি। নিজ মেয়েকে বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে আবারও পানিতে ঝাঁপ দেয় স্বপন, পৌছে যায় মেয়ের কাছেও, মেয়েকে ভাসিয়ে তোলার চেষ্টা করতে করতেই তলিয়ে যায় দুটি জীবন, চারটি হাত।

হয়ে যায় জীবিত থেকে মৃত সংখ্যায়…. সপ্তাহ খানেক আগে পাবনার চাটমোহরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বয়ান শুনে আমার মনে পড়ছিলো, সওদা মনির মত আমার বয়স যখন ১২ কি ১৩! তখনই পড়েছিলাম কবি গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ কবিতাটি।

বাদশা বাবর মরনাপন্ন পুত্রের জীবন বাঁচাতে প্রার্থনায় বসলেন- “কহিল কাদিঁয়া – ‘হে দয়াল খোদা, হে রহিম রহমান, মোর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আমারি আপন প্রাণ, তাই নিয়ে প্রভু পুতের প্রাণ কর মোরে প্রতিদান।” এটাই পিতৃ হৃদয়।

যে হৃদয় ধারন করে বাদশা থেকে ব্যবসায়ী, বাবর থেকে রফিকুল। তাই বাবরের মত সন্তানের প্রান বাঁচাতে নিজের নিরাপদ জীবনের ঝুঁকি নেয় রফিকুল। সন্তান সওদা মনিকে বাঁচাতে পারেনি, কিন্তু নিজের চোখের সামনে সন্তানকে ডুবতে দেখার কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার দূঃসহ জীবনকে প্রত্যাক্ষান করে নিজেও জীবনও বিলিয়ে দেয় সে…. পত্রিকায় এসেছে সন্তানের সাথে ডুবে মারা গেছে ঈশ্বরদীর ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম স্বপন।

কিন্তু এটা ভুল, এ মৃত্যুর খবর মিথ্যা! এটা বুঝতে হলে পড়তে হবে জীবন বিনিময় কবিতার শেষ প্যারাটি- “মরিল বাবর – না, না ভুল কথা, মৃত্যু কে তার কয়? মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়, পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরণের পরাজয়।” সন্তান সওদা মনিকে বাঁচাতে গিয়ে রফিকুল ইসলাম স্বপন মরেনি! বরং তার পিতৃ হৃদয়ের কাছে মরনের পরাজয় হয়েছে।

খোঁজখবর/এসআর

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh