চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন

বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল ২০১৯ | ৯:১১ অপরাহ্ণ | 499 বার

চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন
Advertisements

দুর্বৃত্তের দেয়া আগুনে শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ফেনীর সোনাগাজী থেকে ঢাকায় আসার পথে যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে মেয়েটি বলছিলো- “আমি এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো। শেষ নি:শ্বাস থাকা পর্যন্ত”।

একটু পর পর চিৎকার করে বলে উঠছিলো- “এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলব, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলব, সারা দুনিয়ার কাছে বলব, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করব।”

সময় মানুষকে এতটাই সাহসী করে তোলে যে, সে ধারন করে ঐতিহাসিক কোন চরিত্র। যেমন, ফেনীর সোনাগাজীর এক সাধারণ কলেজ ছাত্রী হয়ে উঠলো গ্রিক উপকথার নির্যাতিত চরিত্র ‘ফিলোমিলা’।

রোমান কবি ওভিদ (৪৩ খ্রিস্টপূর্ব-১৭ খ্রিস্টপূর্ব) গ্রিক উপকথা অবলম্বনে ১৫ খন্ডে লিখেছিলেন ‘Metamorphoses’ নামে একটি গ্রন্থ। ওভিদের সরস রচনার কারণে গ্রিক উপকথায় নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়েছিল । ফিলোমিলার উপাখ্যানটিও ওভিদের রচনায় রয়েছে।

সম্ভবত নারী নির্যাতনের সবচেয়ে করুনগাথা এই ‘ফিলোমিলা’। ফিলোমিলা ছিলো এথেন্স নগরের রাজা প্যান্ডিয়ন-এর ছোট মেয়ে। বড় মেয়ে প্রকনি’র বিয়ে হয় থ্রাসের রাজা তেরেউসের সাথে।

বছর ঘুরতে এক ফুটফুটে পুত্র সন্তানের মা হল প্রকনি। সাধারনত মাতৃত্বের সময়টাতে মেয়েরা অনুভব করে মায়ের বাড়ির স্বজনদের, প্রকনি অনুভব করলো বোন ফিলোমিলাকে। তার পীড়াপীড়িতে তেরেউস এথেন্স গেলো ফিলোমিলাকে আনতে।

সুন্দরী ফিলোমিলা কে দেখে তেরেউসের মাথার ভিতরে নষ্ট পোকারা সব কিলবিল করে ওঠে। তেরেউস এবং ফিলোমিলা জাহাজ উঠল। জাহাজে ফিলোমিলা কে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তেরেউস । (আসলে ওটা ছিল ফিলোমিলা কে একান্তে পাবার জন্য ছলনা। আমাদের দেশে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষনের মামলাগুলো দেখলে এ সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে)।

ফিলোমিলা সবই বোঝে। ও হাসতে হাসতে বলে, যাঃ! তাই হয় নাকি। আপনি রসিকতা করছেন দুলাভাই।
তেরেউস – এর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সে আরও ভয়ানক পরিকল্পনা আঁটে।

যথাসময়ে জাহাজ থ্রাসের উপকূলে এসে ভিড়ল। উপকূলে গভীর অরণ্য। জাহাজ থেকে নামার পরপরই ফিলোমিলার হাত ধরে টানতে টানতে অরণ্যে নিয়ে যায় তেরেউস । তারপর অরণ্যের গভীর নির্জনতায় ফিলোমিলাকে ধর্ষন করে পাষন্ডটা!

ধর্ষনের পর নির্যাতিত, অপমানিত ফিলোমিলা বলে-
“এখন আমার কোনও লজ্জ্বা নেই, আমি এই কথাই বলব।
আমাকে সুযোগ দেওয়া হলে আমি মানুষের কাছে যাব।
বলব সবাইকে। যদি আটকে রাখ এখানে-
আমি অরণ্য আর পাথর কে বলব দয়াশীল হতে ।
স্বর্গীয় বাতাস শুনবে আর দেবতারা,
স্বর্গে যদি দেবতা থাকে তারাও শুনবে।”

ওভিদের রচনায় ফিলোমিলার এই বয়ান কী আগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের বয়ানের সাথে মিলে যায় না?

নুসরাতও শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছিলো। শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছিলো মাদ্রাসার অধ্যক্ষর দ্বারা। লজ্জায়, অপমানে সেও ফুঁসে উঠেছিলো। বিচারের জন্য করেছিলো মামলাও। কিন্তু চিরকালই অন্যায় চাপা দিতে সংগঠিত হয় আরো ভয়াবহ অন্যায়।

থ্রাসের গভির অরণ্যে নিজের পাপকে চাপা দিতে ফিলোমিলার জিভ কেটে ফেলে তেরেউস!
এদিকে শ্লীলতাহানির পাপকে চাপা দিতে নুশরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় মাদ্রাসা অধ্যক্ষের চেলারা।

কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। একাকি অরণ্যে চিৎকার করে কাউকে ডাকতে পারেনা যন্ত্রণাকাতর ধর্ষিতা মেয়েটি। সে তার পরনের কাপড়ে সেলাই করে দুর্দশার কাহিনী। অরণ্যমাঝে সে কাপড় পায় একদল শিকারী, যাদের হাত ঘুরে এ দুঃখগাথা পৌছে বোন প্রকনির কাছে। প্রকনি উদভ্রান্ত হয়ে অরণ্যে ছুটে আসে। বোনকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদে । অনেকক্ষণ। তারপর প্রতিশোধের পরিকল্পনা আঁটে।
এর পরের ঘটনা অতি ভয়ানক।

খ্রিস্টপূর্ব গ্রিক উপকথা রেখে আমরা দেখতে পারি ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের বাংলাদেশের বাস্তবকথা, যেটাও অতি ভয়াবহ!

শরীরের ৮০ শতাংশ পোড়া নিয়ে মৃত্যুর প্রহরগোনা মেয়েটি, নিদারুন পিপাসায় বারবার পানি চেয়েছে। পানি না পাওয়া পিপাসার্ত গলায় বারবার বলে গেছে ‘শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত প্রতিবাদ করার কথা’। অবশেষে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়েই মেয়েটি মারা গেলো।

গ্রিক উপকথাতেও মৃত্যু ঘটে। প্রকনি হত্যা করে সন্তান ইটিসকে। সন্তানের করুন পরিনতি দেখে তেরেউস মুহূর্তে উন্মাদ হয়ে ওঠে এবং হাতে কুঠার নিয়ে প্রকনি এবং ফিলোমিলা কে হত্যা করতে ছোটে। প্রকনি এবং ফিলোমিলা দৌড়াতে থাকে এবং দেবতার কাছে প্রার্থনা করে। দেবতারা সবই দেখছিলেন, তাদের তিনজনকেই পাখিতে রূপান্তরিত করেন।

দেবতারা তেরেউস কে হুপি পাখিতে, ফিলোমিলাকে নাইটেঙ্গেল এবং প্রকনি কে চাতক পাখি তে রূপান্তরিত করেন। এই জন্য আজও নাইটেঙ্গেল এবং চাতক পাখির কন্ঠে ঝরে আর্ত করুন সুর। নাইটেঙ্গেল পাখিকে ইউরোপীয় সাহিত্যে ফিলোমিলা বলা হয়।

উপকথা আর বাস্তব কথার তফাৎ বিস্তর। উপকথায় পাপিষ্ঠের পরিনতি করুন হয়। অথচ বাস্তবকথায় পাপিষ্ঠের মুক্তির জন্য মানববন্ধন হয়! উপকথার ফিলোমিলা নাইটেঙ্গেল হয়ে করুন সুরে বলে যায় দুঃখগাথা। যে দুঃখগাথা স্থান পায় সাহিত্যে, সাহিত্যের করুনরসে এ দুঃখগাথা প্রবাহিত হয়। অথচ বাস্তবের নুসরাত পাখি হয়ে উড়াল দেয় আকাশে।

বসন্তের শেষ সপ্তাহ চলছে, বসন্ত আসলে যে পাখিটির কথা বারবার আসে সে ‘কোকিল’। অনেকে বলেন কোকিলের ডাকে বসন্ত আসে।

তবে কোকিলকে নিয়ে মান্নাদে’র চমৎকার একটি গান রয়েছে-
“ও কোকিলা তোরে শুধাইরে
সবারই তো ঘর রয়েছে
কেনরে তোর বাসা কোথাও নাইরে?”

ফিলোমিলা নাইটেঙ্গেল হলে, নুসরাত কী কোকিল?
যে নাইটেঙ্গেলের মত করুন সুরে নয় বরং শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত ডেকে গেলো প্রতিবাদী স্বরে। কোকিলের মতই সবার ঘর থাকলেও তার ঘর নেই, তাই হয়তো নিজ ঘরে আর ফেরা হলো না।

ঘরে ফেরা কথাটি আসতেই মনে পড়লো। নুসরাতের মৃত্যুদিনে ঘরে ফেরা এ সংবাদ। ঢাকা-রাজশাহী নতুন বিরতিহীন ট্রেনের নাম দেয়া হয়েছে “বনলতা এক্সপ্রেস”।
লোকমুখে, বনলতা কথাটি নাটোরের সমার্থক হয়ে গেছে। অথচ, যে ট্রেন নাটোরে যাবে না সেই ট্রেনের নাম দিয়েছে বনলতা।

নুসরাতের মৃত্যুর সময়ে ট্রেনের নামকরণ নিয়ে অসংগতি আমায় ভাবায় না। ভাবতেও চাই না। এ বাজে সময় ভুলতে আমি আবৃত্তি করছিলাম জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’-

” হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীতের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদগ্ধ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রান এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন”

হাজার বছর ধরে কবি কেন পথ হাটছেন? সে কী শুধুই প্রেমের জন্য? যদি প্রেমের জন্য তবে কবি কেন ক্লান্ত? প্রেম তো ক্লান্তিহীন। আবার কবি বলেছেন- ‘চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন’, প্রেমের পথে চলা জীবন এতটা নিরানন্দ হতে পারে না। আবার এই পথচলাকে যখন বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ বলা হয়, তখন নতুন ভাবনার উদয় হয়। বিম্বিসার ছিলেন মগধের অধিপতি(খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৮-৪৯১)। তার পুত্র অজাতশত্রু সিহাংসন দখলে নিয়ে পিতাকে বন্দী করেন। কারাগারে বিম্বিসারকে অনাহারে হত্যা করা হয়। এ পাপের কোন বিচার হয়নি।

আবার মৌর্য সম্রাট অশোক জীবনের শুরুতে ছিলো নিষ্ঠুর, তাই তাকে চন্ডাল বলা হতো। সম্রাজ্যের লোভে কালিঙ্গের যুদ্ধে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। পরে অনুতাপে সে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করে। বিম্বিসার ছিলেন পাপের শিকার অন্যদিকে অশোক অনুতপ্ত পাপী। পাপ, পাপী এবং পাপের শিকার নিয়েই গড়ে ওঠা ধুসর জগৎ-এ কবির পথচলা?

এ জগৎ-এ পাপ শুধু মানুষই করে না, পাপ করে অসীম ক্ষমতাবান দেবতারাও! কবি বলেছেন- দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে। বিদর্ভ নগর হলো মহাভারতে বিবৃত নল-দময়ন্তী উপাখ্যানের নায়িকা দময়ন্তীর পিতৃভূমি। দময়ন্তী বিয়ে করতে চায় নলকে। এতে বিরহী দেবতা কলির কামনার বন্হিশিখায় নিষ্পাপ দময়ন্তীর সংসার পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। অথচ ক্ষমতাবান দেবতার কোন সাজা নেই। বিদর্ভ নগর ক্ষমতার কাছে সাধারন মানুষের জীবনের দূর্বিসহ পরিনতির কথা বলে।

আশ্চর্য! এ প্রেমের কবিতাটাই আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে নিহত নুসরাতের কথা। সমাজের অন্যায় অবিচার ক্লান্তিহীন ভাবে হাজার বছর ধরে দেখে যাওয়ার কথা। পাপ, পাপী আর পাপের শিকারের ধুসর জগৎ দেখার কথা। বিদর্ভ নগরে ক্ষমতাবানের হাতে নিরপরাধের দুর্বিসহ জীবনের কথা।

ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিরতিহীন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ রাজশাহীতে থামবে। কিন্তু চারিদিকে জীবনের যে সমুদ্র সফেন, এর কী কোন ভাটা আছে?

জীবনানন্দ দাসের মতই জগৎ-এর প্রতিকারহীন দূর্ভাবনায় আমি এক ক্লান্ত প্রাণ, চারিদিকে জীবনের সফেন সমুদ্র শুভবোধকে জোয়ারের নোনাজলে চুবিয়ে যাচ্ছে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh