ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, আর নয় দেশত্যাগ

শুক্রবার, ০৫ জুলাই ২০১৯ | ১:১৪ পূর্বাহ্ণ | 1057 বার

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, আর নয় দেশত্যাগ

আমার বাড়ি হান্ডিয়াল(পাবনা) ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা।হান্ডিয়ালের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ মন্দিরও প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো।হান্ডিয়াল জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম।

হান্ডিয়াল বাজারে আমার দাদা(রিয়াজউদ্দীন মহাজন)ই প্রথম মুসলিম হিসেবে জায়গা কিনে বসতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে ব্রিটিশ আমলে। চারপাশে,পুরো বাজারে সবাই ছিল হিন্দু,আমাদের পরিবার ছিল একমাত্র মুসলিম।

এখনও আমাদের বাড়ির চারপাশের প্রতিবেশীরা সবাই হিন্দু।ছোটবেলায় পাশের বাড়ির কাকীমা রাকেশের মায়ের হারমোনিয়াম বাজিয়ে রেয়াজ করার সুরে অথবা শীতকালে কীর্তনের শব্দে বা চড়ক পূজার হাজরা নাচের ঢাকের বাদ্য শুনে আমার ঘুম ভাঙত।

৪৭ এর দেশভাগ ,মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও হান্ডিয়ালের অনেক হিন্দু ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। আমি নিজে ছোটবেলায় দেখেছি আমার বাড়ির পাশের প্রতিবেশী,বন্ধু-বান্ধবদের অনেকে ভারতে চলে গেছে।

মাঝে মাঝে হঠাৎ একদিন শুনতাম বাড়ির পাশের প্রতিবেশী নব জেঠুরা নেই,কমল দা-লিলি দি-বিজন কাকা-রাধামাধব দাদু’রা নেই,রুপা-সুমন দা’রা নেই,উত্তম দা-সরস্বতী দি’রা নেই, আমার ছোটবেলার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাশের বাড়ির রাকেশ-রাজকমল-টোলা’রা নেই, মিলটন দা নেই,বাদল কুন্ডু জেঠুরা নেই,বিশা পাল জেঠুরা নেই, এমন পরিচিত অনেকেই নেই।শুনে খুব খারাপ লাগত।

ছোট মনে প্রশ্নও জাগত, কেন ওরা চলে গেল নিজেদের বাড়িঘর-দেশ ছেড়ে?চলে যাওয়া তাদের বাড়িঘর কিনে নতুন কোন হিন্দু বা মুসলিম পরিবার বসতি শুরু করত। তারা হয়ে উঠত আমাদের নতুন প্রতিবেশী।

পরে আমি বড় হয়ে ভারতে গিয়ে হান্ডিয়াল ছেড়ে চলে যাওয়া প্রতিবেশীদের অনেকের বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছি। এতদিন পর বড় হয়ে যাওয়া আমাকে দেখে তাদের সে কি আনন্দ, আন্তরিক আতেথিয়তা-আপ্যায়ন।তাদের কাছে শুনেছি কেন তারা চলে গেল দেশ ছেড়ে?

শুনে মনে হল,কারণগুলো আসলে যতটা না সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন,তার চেয়ে বেশি ছিল নিরাপত্তাহীনতাবোধ।চলনবিলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হান্ডিয়ালে আগে মাঝে মাঝেই খুব ডাকাতি হত,হান্ডিয়ালে বা আশপাশে কোন থানা ছিল না।

যদিও ডাকাতি ধনী হিন্দু-মুসলিম সব বাড়িতেই হত,কিন্তু এতে হিন্দুরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করত বেশি।কেউ কেউ কর্মসংস্থান বা উচ্চাভিলাষীতা বোধ থেকেও ভারতে পাড়ি জমিয়েছে।

পরবর্তীতে হান্ডিয়ালে মিনি থানা (পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র) হল,রাস্তাঘাট হল। সেইসাথে হান্ডিয়াল জগন্নাথ মন্দিরের বর্তমান প্রধান পুরোহিত ও গোসাই তপন ব্রক্ষ্মচারীর তত্ত্বাবধানে জগন্নাথ মন্দিরের পাশে আধুনিক নজরকাড়া ডিজাইনের বিভিন্ন নতুন মন্দির হল, যে ধরনের মন্দির পুরো বাংলাদেশের মধ্যেই এক্সক্লুসিভ।

এতে,হান্ডিয়ালের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ মন্দির ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের এসব নতুন মন্দিরের পরিচিতি আরও বাড়তে লাগল দেশজুড়ে। প্রতিবছর রথযাত্রায় হান্ডিয়ালে দেশ-বিদেশের ২০-২৫ হাজার ভক্ত-দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। এতে,হান্ডিয়াল বাজার ও আশপাশের গ্রামে বসবাসরত হিন্দুরা মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত হল। তাদের মনোবল বাড়ল।

ফলে তারা ভারতে পাড়ি জমানোর মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে বর্তমানে নিজেদের নতুন নতুন বিল্ডিং বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছে। এখনও হান্ডিয়ালের পুরনো বড় বড় ব্যবসায়ীরা বেশিরভাগ হিন্দু। এ যেন হান্ডিয়ালের হিন্দু সম্প্রদায়ের নব জাগরণ, যেটা পুরো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রোল মডেল হতে পারে।

হান্ডিয়ালের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আপনারা হান্ডিয়ালে এসে দেখে গিয়ে মূল্যায়ন করুন। এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাঝেই আমার বেড়ে ওঠা। আমার অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা গড়ে ওঠার ভিত্তিভূমি আমার প্রাণের হান্ডিয়াল।

হান্ডিয়ালের আগের নাম ছিল হাঁড়িয়াল।

লেখক-হুমায়ন কবির, হান্ডিয়াল, চাটমোহর, পাবনা।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টঃ WebNewsDesign