গ্রাম আদালতে উপকার পাচ্ছেন করমজা ইউনিয়নের মানুষ

শনিবার, ২০ নভেম্বর ২০২১ | ১:০০ অপরাহ্ণ | 42 বার

গ্রাম আদালতে উপকার পাচ্ছেন করমজা ইউনিয়নের মানুষ

স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও তৃণমুল পর্যায়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সকল শ্রেণীর মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করে হয়রানি আর আর্থিক ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দেশে গ্রাম আদালত গঠনের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার। ২০০৬ সালে স্থায়ী সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের গ্রাম আদালত আইন পাস হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইউএনডিপি এবং বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নকৃত বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) কার্যক্রম শুরু হয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে সহযোগীতা করছে ওয়েব ফাউন্ডেশন। এই কার্যক্রমের অংশ হিসাবে পাবনা জেলার ৯টি উপজেলার ৭৪টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণের কার্যক্রম চলমান।

সেই ধারাবাহিকতায় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার করমজা ইউনিয়নের গ্রামের মানুষের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান হচ্ছে এই গ্রাম আদালতেই। ইউপি চেয়ারম্যান এবং দু’জন মেম্বারসহ মোট পাঁচজন সদস্য নিয়ে এই গ্রাম আদালত গঠিত হয়। এছাড়াও বাদী-বিবাদীর প্রতিনিধি হিসেবে একজন করে গ্রাম্য প্রধান এ আদালতের সদস্য হিসেবে থাকেন। গ্রাম আদালত বিভিন্ন দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিরোধ নিস্পত্তি করা হয়। এই ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের সক্রিয়তা অনুসন্ধানে জানা যায়, শুনানি করে বিচার নিষ্পত্তির দিক দিয়ে সাঁথিয়া উপজেলার করমজা ইউনিয়ন সকল ইউনিয়নের মধ্যে এগিয়ে গেছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী বাগচী।

করমজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযেদ্ধা হোসেন আলী বাগচী এই গ্রাম আদালতের সভাপতিত্বে গত সাড়ে চার বছরে তার ইউনিয়নের জনগনের অসংখ্য বিভিন্ন ধরনের দু’পক্ষের অভিযোগ মামলার সমস্যা সমাধান করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। যা সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সচলভাবে পরিচালিত হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন করমজা ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ। ছোটখাট বিরোধ নিরসনে জেলা-উপজেলার আদালতে আসার সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে। চলতি বছর উপজেলার গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে সহস্রাধিক মামলা। বিচার পদ্ধতি সহজ ও ভোগান্তি ছাড়া হওয়ায় উকিল মোক্তারের পরিবর্তে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর আস্থা রাখছেন ইউনিয়নবাসী। তাইতো এ ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে গ্রাম আদালত। বিশেষ করে বিবাহ বিচ্ছেদের সমস্যা সমাধানে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে গ্রাম আদালত।

জানা যায়, অল্প সময়ে-স্বল্প খরচে স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট বিরোধ নিষ্পত্তি গ্রাম আদালতের মূল লক্ষ্য। নির্ধারিত ফি সহ আবেদনকারীর স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র জমার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবেদনপত্র যাচাই বাছাই করবেন। আবেদনপত্রটিতে প্রয়োজনীয় তথ্য ঠিকভাবে উল্লেখ আছে কিনা, আবেদনটি সংশ্লিষ্ট গ্রাম আদালতের এখতিয়ার এবং আনুষঙ্গিক সার্বিক বিষয় চেয়ারম্যানকে নিশ্চিত করে সপ্তাহের একদিন প্রতি বৃহস্পতিবার ইউনিয়ন পরিষদের হল রুমে গ্রাম আদালত অনুষ্ঠিত হয়।

এই আদালতে বাদি ও বিবাদি শব্দের পরিবর্তে ব্যবহৃত হবে আবেদনকারী ও প্রতিবাদী শব্দ দু’টি। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও স্বাক্ষ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে গ্রাম আদালত শুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। গ্রাম আদালত আইনে আরো উল্লেখ্য রয়েছে, যদি কোন কারণে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বিরোধী কোন পক্ষ নিরপেক্ষ বলে মনে না হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবর কারণ উল্লেখ করে আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গ্রাম আদালতের জন্য মনোনীত সদস্য ছাড়া অন্য কোন সদস্যকে গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করতে পারে। তবে এই আদালতে কোন আইনজীবী নিয়োগ করা যাবে না। গ্রাম আদালতের বিচারকার্যের ক্ষেত্রে অনিবার্যকারণে সরকারি কর্মচারী অথবা পর্দানশীল বা বৃদ্ধ মহিলা কিংবা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রতিনিধি মনোনীত করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির লাগবে।

মামলার শুনানির জন্য নির্ধারিত তারিখে ইচ্ছাকৃতভাবে আবেদনকারী বা প্রতিবাদী হাজির না থাকলে আদালত তা নাকচ করে দিতে পারবে অথবা প্রতিবাদীর অনুপস্থিতিতেই মামলাটি শুনানি বা নিস্পত্তি করতে পারবে। নাকচকরণ বা একতরফা শুনানির সিদ্ধান্ত গ্রহণের দশদিনের মধ্যে আবেদনকারী বা প্রতিবাদী আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং অনুপস্থিতির যৌক্তিকতা তুলে ধরে মামলাটি পুনর্বহাল করে পুনরায় শুনানি করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাজারো প্রান্তিক মানুষ গ্রাম আদালতের সুবিধা পাচ্ছে। গ্রাম আদালত প্রকল্প চালু হওয়ার পূর্বে গ্রাম আদালতে বিচারযোগ্য অভিযোগ বা বিরোধ গুলো প্রায়ই স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতো বা থানায় যেত। কিন্তু বর্তমানে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে যেখান থেকে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায় বিচার পাচ্ছে। একইসাথে করমজা ইউনিয়নে গ্রাম আদালতে ও প্রতি মানুষের আস্থা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় সালিশ ও কমেছে।

ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সমাসনারী গ্রামের কৃষক শওকত উসমান ও একই গ্রামের কোরবান আলী গং এর মধ্যে ৫ শতাংশ জমিজমা নিয়ে বিরোধ হয়। প্রথমে স্থানীয় মাতব্বর ব্যাক্তিদের কাছে সমাধান চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু কোনো সমাধান পায়নি। পরে শওকত উসমান পাবনা কোর্টে মামলা করার পর এক বছর ঘুরেও সমাধান পাচ্ছিলেন না। এতে তাঁর অনেক টাকাও খরচ হয় বলে জানা যায়। পরে স্থানীয় করমজা ইউনিয়ন পরিষদে ১০ টাকা দিয়ে গ্রাম আদালতের কাছে সুষ্ঠ বিচার এর জন্য আবেদন করে। পরে গ্রাম আদালতে দুই পক্ষের কাগজপত্র যাচাই বাছাই শেষে শুনানি হয়। সেখানে তিনি ন্যায় বিচার পান এবং তার জমি তিনি ফিরে পান বলে এ প্রতিবেদক কে জানান শওকত উসমান।

করমজা ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী বাগচী বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্টী ছোট ছোট বিরোধ হলে ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য উচ্চ আদালতে বা থানায় না গিয়ে আমাদের গ্রাম আদালতে অভিযোগ দিচ্ছে এবং অল্প খরচে, স্বল্প-সময়ে ন্যায় বিচার পাচ্ছেন। আমরা আলাপ-আলোচনা করে কাগজ দেখে সুষ্ঠু সমাধান দিই। এতে গ্রামের সাধারণ মানুষ এই গ্রাম আদালতের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে।

চেয়ারম্যান বলেন, এছাড়াও ফৌজদারি মামলা একবারে নাই বললে চলে, তা ছাড়া অন্যান্য বহু মামলা আমরা গ্রাম আদালতে মাধ্যমে সমাধান করে দিচ্ছি। যদিওবা বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমসিম খেতে হয় কারণ এমনও সপ্তাহে ৫-৭ টি বিচার করতে হয়। তবুও সবার সমস্য সমাধান করে দিচ্ছি।

সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসিফ মোহাম্মদ সিদ্দিকুল ইসলাম বলেন, সাঁথিয়া থানাধীন যে কয়টি ইউনিয়ন আছে তার মধ্যে করমজা ইউনিয়ন থেকে আমাদের থানাতে তুলনামূলকভাবে অভিযোগ কম আসে। করমজা ইউনিয়নের গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হওয়া এবং সঠিকভাবে বিচার কার্যক্রম সমাধান হওয়ায় গ্রাম আদালতের প্রতি জনসাধাররণের প্রতি একটা আস্তা এসেছে।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম জামাল আহম্মেদ বলেন, অল্প সময়ে এবং স্বল্প খরচে গ্রাম আদালতে সঠিক বিচার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। উভয়পক্ষের মনোনীত ব্যক্তির সমন্বয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন হয় বলে গ্রাম আদালতে ন্যায় বিচার পাওয়া সম্ভব। গ্রাম আদালতে সমস্যা নিষ্পন্ন হলে উভয়ের মধ্যে পূর্বের ভ্রাতৃত্ববোধ ফিরে আনা যায়। গ্রামের বিচার গ্রামেই নিষ্পত্তি হলে এলাকার অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পেয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে। তাছাড়া গ্রাম আদালতের কারণে উপজেলা জজ ও জেলা জজসহ বিভিন্ন আদালতে মামলাজট কমিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদী মানুষের হয়রানি কমবে। করমজা ইউনিয়নের গ্রাম আদালতে বিচার ব্যাবস্থা দিনদিন প্রশংনীয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন ইউএনও।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টঃ WebNewsDesign