ক্রাইম পেট্রোল দেখে শিশুকে হত্যাচেষ্টা ; ৩ বন্ধু আটক

মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১১:১৮ অপরাহ্ণ | 653 বার

ক্রাইম পেট্রোল দেখে শিশুকে হত্যাচেষ্টা ; ৩ বন্ধু আটক
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু আরাফাত।
Advertisements

বন্ধুদের কাছে চাকাযুক্ত জুতো (স্কিডিং কেড্স) বিক্রির আড়াই হাজার টাকা চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইয়াসিন আরাফাত (১২) নামের এক শিশুকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে তিন কিশোরের বিরুদ্ধে। ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ক্রাইম পেট্রোল দেখে এ হত্যাচেষ্টার ছক সাজিয়েছিলেন তারা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের এমনই লোমহর্ষক তথ্য দিয়েছে আটক তিন কিশোর। আর মৃত ভেবে ফেলে রাখার দীর্ঘ প্রায় ১৩ ঘন্টা পর রক্তাক্ত মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকা শিশু আরাফাতকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার গড়গড়ি গ্রামে ঘটে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা।

জানা গেছে, গড়গড়ি গ্রামের আকমল হোসেন মল্লিকের তিন মেয়ের পর আদরের একমাত্র ছেলে সন্তান ১২ বছরের ইয়াসিন আরাফাত। আওতাপাড়া সানফ্লাওয়ার কিন্ডারগার্ডেনের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। গত রোববার (১৫ ডিসেম্বর) সকাল আটটার পর বাড়ি থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সাথে খেলাধুরার পর আর বাড়িতে ফেরেনি সে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে রাত দশটার দিকে থানা পুলিশকে জানান বাবা আকমল হোসেন। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে রাত সাড়ে দশটার দিকে অভিযানে নামে ঈশ্বরদী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অরবন্দি সরকার, এসআই অসিত কুমার বসাক, এসআই শরিফুল ইসলামসহ সঙ্গীয় ফোর্স। রাত এগারোটা দশ মিনিটে প্রথমেই আরাফাতের এক বন্ধু রাফিকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা।

এরপর তার আরো দু’বন্ধু রাফিন ও প্রিন্সকে ডেকে নিয়ে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এক পর্যায়ে তারা আরাফাতকে হত্যার কথা স্বীকার করে। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী রাত দেড়টার দিকে বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটি আখের ক্ষেতের মধ্যে থেকে শিশু আরাফাতকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আর আটক তিনজনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ঘটনার পর হাসপাতালে আহত আরাফাত

যেভাবে আরাফাতকে হত্যার পরিকল্পনা : শিশু আরাফাত তার চাকাযুক্ত কেডস কয়েকমাস আগে তার বন্ধু রাফি’র কাছে আড়াই হাজার টাকায় বাকীতে বিক্রি করে। কিন্তু সেই টাকা না দেয়ায় মাঝেমধ্যে আরাফাত টাকা চাইতে থাকে রাফি’র কাছে। কিন্তু রাব্বি টাকা দিতে পারে না। রাফি’র সখের অনেকগুলো কবুতর আছে। শেষে আরাফাত বলেছিল যে, ‘রাফি তুই টাকা দিতে পারছিস না, তুই আমাকে কবুতর দে।’ কিন্তু রাফি কবুতর দিতে রাজি হয় না। এদিকে আরাফাত টাকার জন্য চাপ দিতেই থাকে। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার মাঝে রাফি তার অপর দুই বন্ধু রাফিন ও প্রিন্সকে নিয়ে তৈরী করে আরাফাতকে হত্যার পরিকল্পনা। কারণ, আরাফাতকে শেষ করতে পারলে আর টাকা দিতে হবে না। পরিকল্পনা করে কৌশলে গ্রামের একটি আখ ক্ষেতে নিয়ে আরাফাতকে হত্যা করার। এর মধ্যে রাফি তাদের বাড়িতে থাকা অনুমান এক ফুট দৈর্ঘ্যর লোহার তৈরী রড একটি বাজার করা ব্যাগে নিয়ে আগেই ঘটনাস্থলে (আখ ক্ষেতে) গিয়ে রেখে আসে।

এরপর ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে কৌশলে আরাফাতকে আখের ক্ষেতে ডেকে নিয়ে যায় রাফি, রাফিন ও প্রিন্স। আরাফাতের থেকে রাফি খাটো হওয়ায় সে তাকে মাথায় আঘাত করতে সুযোগ পারছিলনা। তাই রাফি আরাফাতকে বলে, আখের গোড়ার দিকে যে নতুন কুশি বের হইছে তুই সেগুলো বসে থেকে ভেংগে দে। বাড়িতে নিয়ে লাগালে সেগুলো আবার গাছ হবে। আরাফাত রাফি’র কথা মতো তাই করতে আখের গাছের গোড়ায় বসলে আরাফাতের পিছন হতে আগে থেকে রাখা সেই রড দিয়ে ক্রমাগত মারতে থাকে রাফি। রক্তাক্ত অবস্থায় আরাফাত মাটিতে পড়ে গেলে সাড়া শব্দ না পেয়ে মৃত ভেবে ফেলে রেখে তারা জলে যায়। আঘাত করা লোহার রড বাড়িতে যাওয়ার সময় রাফি একটি পুকুরে ফেলে দেয়। অবশেষে রাফি পুলিশকে জানায়, সে ভারতীয় ক্রাইম পেট্রোল সিরিয়াল দেখে এই পরিকল্পনা করতে অনুপ্রানিত হয়েছে। রাফি, রাফিন ও প্রিন্স বাঁশেরবাদা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র।

এ বিষয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া ঈশ্বরদী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অরবিন্দ সরকার বলেন, শীতের মধ্যে রাত দেড়টায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে আখ ক্ষেতের মধ্যে টর্চলাইটের আলোতে একটা শিশুকে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন কাজ ছিল। তারপর অনেক খুঁজে যখন আমরা আরাফাতের সন্ধান পাই, তখন সবাই ভেবেছিলাম হয়তো সে মারা গেছে। কারণ শিশু আরাফাতের মাথায় অনেগুলো আঘাত, মাথার মাংসগুলো বেড়িয়ে আসছে, বাম কান অধিকাংশ অংশ কাটা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তার কাছে গিয়ে পালস দেখি সে বেঁচে আছে। মুখ থেকে খুব আস্তে ‘আব্বু আমাকে বাঁচাও’ শব্দ বের হচ্ছে। দ্রæত তাকে উদ্ধার করে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এভাবে আঘাত করার দীর্ঘ ১৩ ঘন্টা পরও একটা শিশু কিভাবে বেঁচেছিল এখনও ভাবতে অবাক লাগে।

আরাফাতের বাবা আকমল হোসেন মল্লিক বলেন, তার ছেলের খেলার সাথীরাই যে তাকে এভাবে হত্যার চেষ্টা করবে সেটা মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তারপরও এমন নিষ্ঠুর ঘটনার বিচার দাবি করেন তিনি। কারণ এমন ঘটনার বিচার না হলে পরবর্তীতে এই কিশোররা আরও বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

রাজশাহী মেডিকেলের নিউরো সার্জারি বিভাগের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে আরাফাতের। সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক ডা: আ ফ ম মোমতাজুল হক গণমাধ্যমকে জানান, রডের উপর্যুপুরি আঘাতে মাথার একটা অংশে খুলির হাড় ভেঙে মগজে চাপ দিচ্ছে। ভালো হতে দ্রæত অপারেশন প্রয়োজন।

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহাউদ্দিন ফারুকী জানান, ঘটনায় জড়িত অভিযোগে আটককৃতরা মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) বিকেলে পাবনার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর আগে আরাফাতের চাচা আবু তাহের মল্লিক বাদি হয়ে আটক তিনজনকে আসামী করে ঈশ্বরদী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) শামীমা আক্তার বলেন, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে অপরাধের ধরণও পাল্টে যাচ্ছে। শিশুরা ক্রাইম পেট্রোল দেখে হত্যার মতো কাজে উৎসাহিত হচ্ছে, এটা খুবই আতংকের একটি বিষয়। টেলিভিশন দেখা খারাপ না। তবে সেখান থেকে ভালো জিনিসগুলো গ্রহণ করতে হবে। পরিবারকেও তাদের সন্তান সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে ।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh