এক পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন রনি’র

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯ | ৯:৩১ অপরাহ্ণ | 958 বার

এক পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন রনি’র
এক পা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাচ্ছেন রনি
Advertisements

আর দশটা ছেলের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা বা খেলাধুলা করতে পারেন না তরিকুল ইসলাম রনি (২০)। কারণ তার একটি পা নেই। বাড়িতে যতক্ষণ থাকেন, এক পায়ে লাফিয়ে লাফিলে চলতে হয় তাকে। তারপরও একটি পা নিয়েই প্রায় সাত বছর ধরে লেখাপড়ায় সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন অদম্য মেধাবী এই কলেজছাত্র।

বাইসাইকেল চালিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করেন তিনি। এতে তাকে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার পথ এক পায়ে সাইকেল চালাতে হয়। তবুও পঙ্গুত্ব বা দারিদ্রতা তাকে দমাতে পারেনি। সব কষ্টকে মাড়িয়ে এক পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রনি।

পাবনার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের মুশাগাড়ি পশ্চিমপাড়া গ্রামের মো: মুন্নাফ হোসেন ও চম্পা খাতুন দম্পতির সন্তান তিনি। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে রনি বড়। ছোট বোন রানী খাতুন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। এ বছর চড়ইকোল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ মাইনাস গ্রেডে এসএসসি পাশ করে চাটমোহর পলিটেকনিক এন্ড টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন রনি। প্রতিদিন বাড়ি থেকে এক পায়ে বাইসাইকেল চালিয়ে কলেজে যাতায়াত করতে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় তাকে। নিজের অদম্য মনোবল দিয়ে এই এক পা নিয়ে প্রায় ৭ বছর ধরে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম করছেন তরিকুল ইসলাম রনি। এভাবেই এসএসসি পাশ করে এখন কলেজে পড়ছেন এই তরুণ।

এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাচ্ছেন রনি। ইনসেটে রনি’র কাটা পা।

আলাপকালে রনি জানান, ২০১২ সালে চড়ইকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় একদিন চাচার সাথে মোটরসাইকেলে পাবনা শহরে যান তিনি। ফেরার পথে সন্ধ্যার দিকে শ্যালোইঞ্জিন চালিত ভুটভুটি সামনে থেকে তাদের মোটর সাইকেলকে ধাক্কা দিলে গুরুতর আহত হন রনি। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা।

তারপর সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরলেও হতাশা জেঁকে বসে রনির মনে। এক পা নিয়ে কিভাবে চলবেন তিনি, আর কিভাবেই বা করবেন লেখাপড়া। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন এক পা নিয়েই সংগ্রাম চালানোর। তারপর থেকে শুরু, আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এসএসসি পাশ করে তিনি এখন কলেজ শিক্ষার্থী। আর এক পা দিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রাম থেকে প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করেন। এজন্য পাড়ি দিতে হয় প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ। তবে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বা খেলতে না পারার আক্ষেপটা তাকে খুব পীড়া দেয়।

তরিকুল ইসলাম রনি জানান, বর্তমানে তো অনেক পঙ্গু ও প্রতিবন্ধী মানুষ সমাজে ভাল কিছু করছে, সরকারি চাকুরীও করছে। তাই পড়ালেখাটা ছাড়ি নাই, ইচ্ছাশক্তি ছিল আমি পারবো। তাই চেষ্টা করে যাচ্ছি। পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হতে চান তিনি। বলেন, পড়ালেখা শেষ করে একটা চাকুরীর ব্যবস্থা হলে আমার এক পা না থাকার কষ্টটা ভুলতে পারবো।

রনি আরো জানান, এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাওয়া-আসা করতে খুব কষ্ট হয়। একটা আর্টিফিসিয়াল পা হলে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারবো। যার মুল্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা, কিন্তু কেনার সামর্থ্য নেই আমাদের। সেইসাথে একটি ব্যাটারী চার্জার সম্বলিত সাইকেল হলে কলেজে যাতায়াত আমার জন্য সহজ হতো।

বাবা-মা ও ছোট বোনের সাথে রনি।

রনির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ইটের ঘর। বাড়ির জায়গা ছাড়া জমিজমা তেমন নেই। বাবা মুন্নাফ হোসেনের এক চোখ নেই। রাস্তার সাথে বাড়ির একটি কক্ষে ছোট্ট মুদিখানা দোকান ও চা বিক্রি করে চলে চারজনের সংসার। সবমিলিয়ে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালানো দুরুহ হয়ে পড়েছে।

মুন্নাফ হোসেন বলেন, রনি যে কষ্ট করছে, সে যেন মানুষ হতে পারে। সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, একটা চাকুরী করে জীবনটা কাটাতে পারে সেই আশা করি।

কান্নাজড়িত কন্ঠে মা চম্পা খাতুন বলেন, ছেলের জন্য দোয়া করি সে যেন সমাজে ভাল দাম পায়। ছেলেটা পঙ্গু, এক পা নেই, কেউ যেন তাকে অবহেলা না করে। একটি প্রতিবন্ধী কার্ডের জন্য স্থানীয় মেম্বারের কাছে ধর্না দিয়েও কাজ হয়নি। প্রতিবন্ধী ভাতা পেলে উপকার হতো।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরকার অসীম কুমার খোঁজখবরকে জানান, অদম্য শিক্ষার্থী রনি ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়াবে উপজেলা প্রশাসন। রনিকে আর্টিফিসিয়াল পা ও ব্যাটারী চালিত চার্জার বাইসাইকেল দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সেইসাথে তার প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেয়ার ব্যবস্থাও গ্রহণ করবে উপজেলা প্রশাসন।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh