একালকে এগিয়ে থাকতে হবে সেকালের চেয়ে

শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১:৩৯ অপরাহ্ণ | 570 বার

একালকে এগিয়ে থাকতে হবে সেকালের চেয়ে

একসময় জনহিতৈষী জমিদারেরা জনগণের পানিকষ্ট দূর করার জন্য দীঘি খনন করতেন। যে দীঘিগুলো পরবর্তিতে প্রচার পেয়েছে জনকল্যানের নিদর্শন হিসাবে। এ দেশ নদীর দেশ, এ দেশ জলের দেশ। তবুও কেন জলকন্যা এ দেশে পানীয় জলের কষ্ট দূর করতে দীঘি খননের প্রয়োজন পরতো? সে প্রয়োজনটা কেনইবা ছিলো সে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যান? এ প্রশ্ন আমাকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

জলের মত এদেশ তো গানেরও দেশ, এ দেশের একটি গান এ প্রশ্নের তৃষ্ণা আরো বাড়িয়েছে- “লালন মরলো জল পিপাসায় থাকতে নদী মেঘনা, আমার হাতের কাছে ভরা কলস তৃষ্ণা মেটে না” মেঘনা নদী থাকতেও লালন কেন জল পিপাসায় মরবে? হাতের কাছে ভরা কলস থাকতেও কেন তৃষ্ণা মিটবে না? কেন নদী, হাওর-বাওর, পুকুর-ডোবার এ দেশে পানিকষ্ট দূর করতে দীঘি খনন প্রয়োজন পরবে? এ প্রশ্নের উত্তরটা আমি পেয়ে গেছি অভিনব ভাবেই!

গত বছর (২০১৭) থেকে আমার এলাকা পাবনার চাটমোহরে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে সাঁতার প্রশিক্ষণ আয়োজন করছি। গত বছর ১৬৩ শিশুকে এবং এবছর ১৯৫ শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছি। বলে রাখি, এ অঞ্চলটা চলনবিলের অংশ, মফস্বল এ শহরের বুকচিরে বয়ে গেছে বড়াল নদ, পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গুমানী আর চিকনাই নদী, এছাড়াও আছে অসংখ্য পুকুর, ডোবা, খাল।

প্রতি বছর এ অঞ্চলে বন্যা হয়, প্রতি বছর অসংখ্য শিশু এখানে পানিতে ডুবে মারা যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় জরিপে এদেশে প্রতিদিন পানিতে ডুবে মারা যায় ৫৩ জন, এদেশের শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশ পানিতে ডুবে। শহরের কথা না হয় বাদ দিলাম, চলনবিলের অংশ হওয়া, কয়েকটি নদী ধারন করা, অসংখ্য পুকুর থাকা অঞ্চলের অধিকাংশ শিশু কেন সাঁতার জানে না? কেন সুযোগ থাকার পরেও শিশুরা হচ্ছে সুবিধা বঞ্চিত? এটা কী মেঘনা নদী থাকতেও লালনের জল পিপাসায় মরার মত নয়? এটা কী হাতের কাছে ভরা কলস থাকার পরেও পিপাসার্ত থাকার মত নয়?

কী বলবেন একে, অভিভাবকদের অসচেতনতা? প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় যখন শিশুদের চাপিয়ে দেয়া হয়েছে নিজ ওজনের চেয়েও ভারী স্কুল ব্যাগ, তার বিনোদনের সময় খেয়ে নেয়া হয়েছে স্কুল, কোচিং আর প্রাইভেটের দৌড়াদৌড়িতে? নাকি জীবিকার তাগিদে সন্তানকে দেবার মত সময় নেই অভিভাবকদের?

গত দুই বছর শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম এর পেছনের বড় কারন! চাটমোহরের কথাই যদি বলি, ছোটবেলায় আমি যে নদীতে সাঁতার শিখেছি, সে বড়াল নদ এখন কচুরীপানার ভাগার। বিলে বানের পানি আসে বটে তবে নতুন সে পানিতে নামলে গা চুলকাবে। বাকি থাকে পুকুর, কিন্তু পুকুর তো কেউ ফেলে রাখে না, পুকুরে হয় মাছ চাষ, সে মাছের খাদ্য দেয়া হয় মুরগীর বিষ্ঠা-গরুর গোবর, ফলে অপরিচ্ছন্ন পুকুর গোসল অনুপযোগী। তাই ইচ্ছা থাকলেও, সন্তানকে সাঁতার শেখানোর আছে কী কোন উপায়?

হাতের কাছে নদী, বীল, পুকুর নামক ভরা কলস থাকলেও কী করে মিটবে তৃষ্ণা? এ প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসতে হবে রাজনীতিবিদদের। এগিয়ে আসতে হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। কয়েক’শ বছর আগের জমিদারেরা যদি জনকল্যানে দীঘি খননের উদ্যোগ নিতে পারেন।

তবে এ আধুনিক যুগের জনপ্রতিনিধিরা কেন জনকল্যানে, বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারন রোধে দীঘি খনন করতে পারবেন না? প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে দীঘি খনন সময়ের প্রয়োজন। যে দীঘিতে সাঁতার শিখবে শিশুরা। এতে শুধু শিশুদের দক্ষতা উন্নয়ন হবে না, হবে উৎকৃষ্ঠ এক ব্যায়াম। যে দীঘিতে গোসল করবে সাধারন মানুষ, ফলে গোছলের জন্য ব্যবহার করা ভুগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।

এই সাধারন উদ্যোগের অসাধারণ ফল বিষয়ে এ দেশের রাজনীতিবিদদের সচেতন হতে হবে। সামনেই এ দেশের জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক দলগুলো জনকল্যানের এ বিষয় তাদের ইশতেহারে যুক্ত করতে পারে। আমাদের আধুনিক রাজনীতিবিদরা শত বছর পূর্বের জমিদারদের জনকল্যান উদ্যোগের কাছে হেরে যাবে, এটা বিশ্বাস করি না।

আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতিবিদেরা জনকল্যানে দীঘি খননের উদ্যোগ নেবেন। যে উদ্যোগে নদীমাতৃক দেশের সন্তানেরা শিখবে নদী মায়ের বুকে ভেসে বেড়ানোর স্নেহ।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টঃ WebNewsDesign