ঈশ্বরদীর এক ইউনিয়নেই ৫৬ ইট ভাটা !

রবিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ১০:২৬ অপরাহ্ণ | 669 বার

ঈশ্বরদীর এক ইউনিয়নেই ৫৬ ইট ভাটা !
Advertisements

পাবনার ঈশ্বদীর উপজেলার একটি ইউনিয়ন লক্ষীকুন্ডা। পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে বিশাল ফসলী চরে বিস্তীর্ণ এই ইউনিয়ন। বিনামুল্যে আর সহজ লভ্য পদ্মা নদী ও চরের ফসলী জমির মাটি। এই সুযোগে গড়ে উঠেছে এক/দুইটি নয়, ৫৬ টি ফিট চিমনির ইট ভাটা।

এসব ইটভাটা গ্রাস করেছে চরের অন্তত ৩০০ বিঘা ফসলী ও বাগানের জমি। ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে পদ্মা নদীর মাটি। ইচ্ছে মতো ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে লাখপতি হলেও রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্রের সরকার।

প্রতিটি ভাটায় কয়লার পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। কাঠ পোড়ানো হলেও দেখ ভালের খবর নেই বন সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তাদের। ইট ভাটা নির্মাণে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিকট থেকে ছাড়পত্র নেয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি ইটভাটার মালিকাগণ।

দুই একটি ইটভাটার নামসত্ত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকলেও অধিকাংশ ভাটার মালিকই তোয়াক্কা করেনি সেই ছাড়পত্রের। ইটভাটা নির্মাণে সরকারি বিধি-বিধানের কোন রুপ তোয়াক্কা না করেই ব্যাঙের ছাতার মতো নির্মাণ করা হয়েছে ইটভাটা।

ফলে কমেছে ফসলের জমি। ফলন কমেছে লিচু, আমসহ অন্যান্য ফলের। আবাদী জমির উপর থেকেও কাটা হচ্ছে মাটি। ইটভাটার ধোঁয়া ও চিমনি থেকে বের হওয়া ময়লায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ ও বাতাস। ইটভাটা গুলোর ট্রাক, ট্রাক্টর, পাওয়ার টলি, শ্যালোর ইঞ্জিন চালিত পরিবহনের অবিরাম চলাচলে সমস্ত রাস্তা ভেঙ্গে জনসাধারণসহ সাধারণ যানবাহন চলাচলের হয়ে পড়েছে অযোগ্য।

স্থানীয়ভাবে প্রচার রয়েছে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই দির্ঘদিন ধরে বীরদর্পে মালিকরা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ইটভাটার ব্যবসা। আর ইটভাটার মালিকদের ব্যবসার মুল সম্বল শুধু লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক ৫ হাজার টাকার ট্রেড লাইসেন্স। গত তিনদিন উপজেলার লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নের বিভিন্ন ইটভাটা ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নের ইটভাটাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ইটভাটা ফসলী, কলা, লিচু, আমসহ বিভিন্ন বাগানের জমির মধ্যে রয়েছে। ইটভাটাগুলোর উপরে ও নিচে জ্বালানি হিসেবে আম, কাঁঠাল, বেল, বাবলা, বট-পাইকরি, খেজুর, ভিটুলু, অন্যান্য গাছের ডাল, খন্ডসহবাঁশের ছোপ স্তুপ করে রাখা হয়েছে। দুই একটি ভাটাতে দেখা গেছে খুবই সামান্য পরিমান কয়লা। পদ্মা নদী থেকে ট্রাক, ট্রাক্টর, টলিসহ বিভিন্ন পরিবহন যোগে কেটে আনা হচ্ছে মাটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কৃষক ও এলাকাবাসী অভিযোগ করে এই প্রতিনিধিকে জানান, লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নে পদ্মানদী কোল ঘেঁষে ফসলী ও বিভিন্ন ফলের বাগানের জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে ৫৬ টি ফিট চিমনীর ইটভাটা। পদ্মা নদী থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার করা হয়। আবার প্রভাব খাটিয়ে চরে থাকা অন্যের ফসলী জমি থেকেও কেউ কেউ মাটি কেটে ভাটায় আনছে। জমির কোন মালিকের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা এখানেই নেই।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসের করা ২০১৫ সালের জরিপ অনুসারে এই ইউনিয়নের ৩০০ বিঘা ফসলী ও বাগানের জমি জুড়ে এই ইটভাটাগুলো রয়েছে।

লক্ষীকুন্ডা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আরিফুল ইসলাম জানান, ইটভাটাতে জ্বালানি হিসেবে কিছু ভাটায় কাঠ আবার কিছু ভাটায় কয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে। পদ্মা নদী থেকেও মাটি কেটে আনা হয়, আবার বাইরে থেকে মাটি কিনে এনেও ব্যবহার করা হয়।

তিনি আরও জানান, কিছু কিছু ইটভাটাতে পরিবেশ অধিদপ্তরে ছাড়পত্র আছে। স্থানীয়ভাবে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে মাসিক নির্দিষ্ট কোন চাঁদা দেয়া হয় না। তবে প্রশাসন ভাটার উপর আসলে খুঁশি রাখতে তাদের কিছু টাকা দেয়া হয়। আবার তাদের প্রয়োজনে চাহিদা মোতাবেক বিনামুল্যে ইট দেয়া হয়। তবে লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের নিকট থেকে ইটভাটার নামে প্রত্যেকেই ৫ হাজার টাকা করে দিয়ে ট্রেড লাইসেন্স নেয়া আছে।

লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান শরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কিছু কিছু ভাটা পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে। এর বেশি ইটভাটা সম্পর্কে মন্তব্য করা নিষ্প্রয়োজন মনে করছি। রাস্তাঘাট ভেঙ্গে যাওয়ার বিষয়ে জনগণ যা বলে তাই লিখা উচিত বলে মন্তব্য করেন এই চেয়ারম্যান।

ফসলী ও বাগানের জমিতে ইটভাটা স্থাপনের বিষয়ে জানতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল লতিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানান, ইটভাটার কারণে লক্ষীকুন্ডার বিশাল বিস্তৃত চরের জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল ও ফলের ফলন কমে গেছে। ভাটার ধোঁয়া ও ময়লা আম, লিচু, কলা ও বিভিন্ন ধরণের ফসলের পাতা এবং গাছে পড়ে ফুল ও ফল আসতে বাধা গ্রস্ত করে।

তিনি আরও জানান, ফসলী, কৃষি ও বাগানের জমিতে ইটভাটা দেয়া নিষেধ। কিন্তু তার পুর্বে কর্মকর্তাগণ কিভাবে এসব ভাটার পক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশে রিপোর্ট দিয়েছে তা তিনি জানেন না।

ইটভাটাগুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানোর বিষয়ে জানতে উপজেলা বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা (ফরেষ্টার) মোঃ ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানান, বিষয়টি দেখার এখতিয়ার তার নেই। জেলা বন সংরক্ষণ কর্মকর্তার অফিস থেকে কোন নির্দেশনা আসলে সেটা তিনি পালন করেন মাত্র।

স্থানীয় প্রশাসনকে ইটভাটার মালিকদের পক্ষ থেকে মাসিক চুক্তিতে নির্দিষ্টহারে টাকা দেয়ার বিষয়ে জানতে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হোসেন ভুঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ইটভাটার মালিকদের নিকট থেকে কোনরুপ চাঁদা নেয়া হয় না। আপনারা পত্রিকায় রিপোর্ট করেন, খুবই শীঘ্র ইটভাটাগুলোতে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আইটি সাপোর্ট ও ম্যানেজমেন্টঃ Creators IT Bangladesh