পাবনায় সাংবাদিকতার ডায়েরি মোসতাফা সতেজ

বুধবার, ০২ জানুয়ারি ২০১৯ | ৯:০১ অপরাহ্ণ | 403 বার

পাবনায় সাংবাদিকতার ডায়েরি মোসতাফা সতেজ
মোসতাফা সতেজ
Advertisements
Share Button

‘৪৫ বছর ধরে তিনি নিয়মিত লাইব্রেরিতে যান এবং পড়াশোনা করেন। ৬১ বছর জীবনে তিনি অনেক সাপ্তাহিক ও দৈনিকে সাংবাদিকতা করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ যাবৎ যত পত্রপত্রিকায় তার সংবাদ প্রকাশ হয়েছে সেই সব সংবাদের শিরোনাম এবং কোন পত্রিকায় কত তারিখ প্রকাশ হয়েছে তা তিনি লিখে রেখেছেন। এজন্য তাকে বলা হয় সাংবাদিকতার ডায়েরি।’

বলছি, পাবনার লেখক-সাংবাদিক মোসতাফা সতেজের কথা।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা করেন, যা এখনও অব্যাহত আছে। বর্তমানে তিনি পাবনার ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইছামতি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এখানেই তিনি কাটিয়ে দিলেন ২৭ বছর।

মোসতাফা সতেজ ১৯৫৭ সালের ১৮ জুন পাবনা শহরের রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সৈয়দ গোলাম হোসেন। মা আনোয়ারা খাতুন। প্রাক মাধ্যমিকেই চর্চা করেন ছড়া লেখার। কয়েক বছরের মধ্যেই ছড়ার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে সাহিত্যের সকল শাখায় বিচরণ শুরু করেন।

মোসতাফা সতেজের শিশু শিক্ষা পাবনা শহরের নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ৩১ বছর বয়সে ১৯৮৮ সালে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার কয়রাবাড়ি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে বৈরাগ্য কাজ করতো। পাশাপাশি দারিদ্র্যতা তো রয়েছেই এবং এসব কারণে তিনি যথাসময়ে এইচএসসি পাস করতে পারেননি।

১৯৯০ সালে আটঘরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৯২ সালে পাবনা কলেজ থেকে বিএ এবং ১২ বছর পরে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে বাংলায় এমএ পাস করেন।

এর আগে তিনি বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন করেন। ১৯৭৬ সালে জীবিকা নির্বাহের জন্য পাবনা সেটেলমেন্ট অফিসে মোহরার সহকারী (মোহরার মামলার আরজি লিখে দিতেন) হিসেবে কাজ করেন। সেই সময় বিনিময়ে দিনে পেতেন ১০ থেকে ১৫ টাকা।

১৯৮০ সালে তিনি চলে যান শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে জানার জন্য। সেখানে ছিলেন দেড় বছর। এ সময় তিনি বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সেখানে একটি হ্যান্ডিক্র্যাফটের দোকানে চাকরি করতেন এবং থাকতেন লজিং মাস্টারের বাড়িতে। ওখান থেকেই শান্তি নিকেতনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত যাওয়া আসা করেন। সেখানে উইলিয়াম রাদিচীর ইংরেজিতে রবী ঠাকুরের ছড়া কবিতা অনুবাদ শোনেন এবং মুগ্ধ হন। ওখানে থেকেই সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রবাস থেকে বিভাগে লিখে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন।

১৯৮১ সালের ১৬ জানুয়ারি তার লেখা প্রথম সংবাদ বিচিত্রায় ছাপা হয়। মায়ের নির্দেশে শান্তি নিকেতনে দেড় বছর অবস্থানের পর আবার পাবনায় চলে আসেন। কিন্ত তিনি থেমে থাকেননি। ১৯৮৪ সালের ১১ মে লেখেন কলকাতার বইয়ের বাজার, পরের বছর ৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় যারা টাকা কেনাবেচা করে এবং পরের সপ্তাহে শান্তি নিকেতনে কোন উৎসব কবে? ইত্যাদি।

একই সালে তিনি পাবনার সাপ্তাহিক বিবৃতি এবং পরে ৬০০ টাকা বেতনে সাপ্তাহিক পাবনা বার্তায় যোগ দেন। ১৯৮৭ সালে দৈনিক করতোয়ার পাবনা প্রতিনিধি, ১৯৮৬ সালে পাক্ষিক দিশা, ১৯৮৯ সালে পাক্ষিক অনন্যা ও তিলোত্তমায় কাজ করেন। এছাড়াও দৈনিক বাংলাবাজার, দৈনিক মানবজমিন, দৈনিক ডেসটিনিতেও কাজ করেন এই প্রবীণ সাংবাদিক। কিন্তু স্বভাবজাতভাবেই তিনি নিজেকে আড়াল করে চলেন। কোনও রকম উচ্চাকাঙ্খাও তিনি প্রকাশ করেননি।

কেবল নিজের পাণ্ডিত্য ও রস বৈদগ্ধে অগ্রজ এবং অনুজদের সামান্য হলেও প্রেরণা জুগিয়ে যান। অনুপ্রাণিত করেন। নিজের দুঃখের কষ্টের কথা কাউকে কখনও বুঝতে দেন না। এমনকি অকালে এক ছেলে এবং অতি আদরের এক মেয়েকে হারিয়েও তিনি সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছেন। এখন পরিণত বয়সে পৌঁছেছেন। লিখছেন সব ধরনের লেখায়। তিনি বলেন, ভালো লেখার আনন্দ স্বভাবতই মোহ সঞ্চার করে। তাই একটা ঘোরের মধ্যে সময় কাটাই।

সংবাদ লেখার পাশাপাশি তিনি সাহিত্য চর্চা এবং লেখালেখি করছেন দীর্ঘদিন ধরে। দাম্পত্য জীবন ও সংসারের কবিতাও রচনা করেন। সংসার রসজ্ঞ প্রেম ও অভাবকে একই শীর্ষবিন্দুতে দাঁড় করিয়ে অন্য এক আলোয় আলোড়িত করেন। তার একটি কবিতা, ‘তিন মুঠো মাটি ও ক্ষমা’ সব চাওয়া পাওয়াকে ম্লান করে দেয়, যা প্রকাশিত হয় দৈনিক ইনকিলাবে ২০০০ সালে।

১৯৭৫ সালে পাবনার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ আর এম একাডেমির বার্ষিকীতে একটি ছড়া দেন। সেই থেকে ছড়ার প্রতি নেশা। এরপর থেকে তিনি চিত্রবাংলা, রোববার, লাবনী, ছুটি, দেশ বাংলা, ইত্তেহাদ, জনকথা, জনতা, ইনকিলাব, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং সাপ্তাহিক ও সাময়িকীতে লিখে চলেছেন ছড়া, গল্প, কবিতাসহ প্রবন্ধ। তিনি বলেন, সাহিত্যের মানসিকতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই সাংবাদিকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৮৪ সালে তার মিনি ছড়া গ্রন্থ’ দুর্ভিক্ষের দেশ’ এবং পরের বছর কিশোরদের জন্য মিনি কবিতাগ্রন্থ ‘স্মৃতি কথার ঢেউ’ প্রকাশিত হয় নিজ উদ্যোগে। ২০০৫ সালে বের করেন কাব্যগ্রন্থ ঘরে ফেরার শেষ গাড়ি। যৌবনের সৃজন কর্মের কথা মনে করে তিনি আজও অভিভূত হন। তার প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে এখনও প্রবল আবেগে আলোড়িত করে।

শতাব্দীকাল আগের যেসব কবি সাহিত্যিকসহ খ্যাতিমান মনিষীর জন্ম মৃত্যুর কেউ খবর রাখেন না, অথচ মোসতাফা সতেজ তাদের জন্ম এবং মৃত্যুবার্ষিকীর কথা নিয়মিত লেখেন ইছামতি পত্রিকায়। এসব সংবাদ এবং লেখা কবে কোথায় ছাপা হয়েছে সেই হিসেবও আশ্চর্যজনকভাবে লিখে রাখেন সযত্নে। যা একেবারেই বিরল ঘটনা।

সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অম্ল মধুর অনেক স্মৃতিকথা মনে আছে তার। ১৯৮৬ সালে ‘মেয়েরা কেরানি বর পছন্দ করে না’ লিখে প্রথম মামলার মুখোমুখি হন। ১৯৯০ সালে পাবনার আন্ডার গ্রাউন্ড মাস্তান বাহিনী শিরোনামে চিত্রবাংলায় লেখার কারণে প্রেস ক্লাব থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে অবশ্য প্রতিবাদ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। সাপ্তাহিক নয়া রাজনীতিতে ব্যাংকের দুর্নীতি নিয়ে লেখায় শহরের ওই সময়ের কথিত শীর্ষ ২ মাস্তান তাকে তুলে নিয়ে যায় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাবনা ছাড়তে বলা হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন নিয়ে লেখার কারণে পুলিশ সুপারের নির্দেশে এক দারোগা তাকে তুলে নিয়ে যান। এতেও তিনি বিচলিত হননি।

চরম দারিদ্র্যতাকে উপেক্ষা করে তিনি এখনও এই পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। অভাব তাকে দমাতে পারেনি এবং তার মুখের হাসিও কেড়ে নিতে পারেনি। তিনি অগ্রজ এবং অনুজপ্রতিমদের সঙ্গে কথা বলেন হাসি মুখে। নিজের অভাব অভিযোগের কথা মুখেও আনেন না।

১৯৮৫ সালে তিনি বিয়েতে বসেন। স্ত্রী সুমনা মৌলি। এক মাত্র মেয়ে সৈয়দা মোসতাফী বৃত্তা। পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি নিজেই।

সাংবাদিক মোসতাফা সতেজ তার ব্যক্তিগত অনেক অপারগতা বা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও লিখে চলেছেন বিরামহীন। তার অনেক বস্তনিষ্ঠ সংবাদে কর্তৃপক্ষ সজাগ হয়েছেন। নাগরিক সমাজ তার সুফল পেয়েছেন। এরকম অজস্র লেখা আছে তার। ১৯৮৭ সাল, তখন তার সাংবাদিকতার বয়স মাত্র ৭ বছর। এ সময় তিনি দৈনিক করতোয়ায় বিশাল সিরিজে তুলে ধরেন পাবনা পৌরসভা ও পৌরবাসীর সমস্যার কথা। বাংলাবাজার পত্রিকায় জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন কালে ১৯৯২-১৯৯৭ এই পাঁচ বছরে অসাধারণ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

দৈনিক মানবজমিনের জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কয়েকটি লেখা আজো অনন্য হয়ে আছে। দৈনিক কিষাণের ছোটদের পাতায় ১৯৮৩ সালে তার অসংখ্য ছড়া-কবিতা-গল্প প্রকাশিত হয়। এ কাগজে অন্যরকম ছড়া শিরোনামে অসংখ্য ছড়া লেখেন, যা দিয়ে একটি বই হয়ে যায়। এ আসরে গল্প প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথমস্থান লাভ করেন।

দৈনিক জনকণ্ঠের ঝিলিমিলি পাতায় ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ এই ৬ বছরে লেখেন, ডাকটিকিটে বর্ণমালার ইতিহাস, ১৯৮৪ সালে তার মিনি ছড়া গ্রন্থ’ দুর্ভিক্ষের দেশ’ এবং পরের বছর কিশোরদের জন্য মিনি কবিতাগ্রন্থ ‘স্মৃতি কথার ঢেউ’ প্রকাশিত হয় নিজ উদ্যোগে। ২০০৫ সালে বের করেন কাব্যগ্রন্থ ঘরে ফেরার শেষ গাড়ি।

সাংবাদিক মোসতাফা সতেজ অনুভব করেন স্ত্রী তার সকল দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে, স্বার্থ ত্যাগ, প্রত্যাশা খুন করে তাকে লেখালেখির মতো পরিবেশ সৃষ্টি করে দেন বলে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি শুকরিয়া আদায় করেন তকদিরে কলম চালাবার শক্তি আছে বলে। লেখালেখির মধ্যেও সর্বশক্তিমানের নির্দেশ পালন করে যাচ্ছেন। প্রকৃতিতে যাই হোক গতানুগতিক আকৃতিতে দশাসই এই নিবন্ধে তার সৃজনের ঐকতান ধরার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। কাউকে না কাউকে শুরু করতে হয়। এটাও সে রকম শুরু করা।

কথায় বলে বাপকা বেটা। যেমন বাবা তেমন মেয়ে-একমাত্র মেয়ে বৃত্তা জানান, সব কিছুর ওপর বাবা তার প্রিয় মানুষ। চাওয়া-পাওয়া নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। সাংবাদিকতা পেশার প্রতি স্ত্রীর আপত্তি থাকলেও তিনি তার কাজে কখনো অসহযোগিতা করেননি।

স্ত্রী সুমনা মৌলি বলেন, যেভাবে আছি ভালো আছি। অনেক মানুষইতো এর চেয়ে খারাপ আছে।

পাবনা শহরের সরওয়ার রহমান বলেন, সাংবাদিক-লেখক মোসতাফা সতেজ এর লেখা আমি নিয়মিত পড়ি। তিনি তথ্য ভাণ্ডার। তার অনেক লেখা থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি, জানতে পারি। তিনি অনেক বড় মাপের এবং একজন প্রতিভাবান মানুষ। অথচ অত্যন্ত সহজ-সরল এবং সাধাসিধে জীবন-যাপন করেন। কিন্তু তিনি তা কাউকে বুঝতে দেন না। এরকম মানুষ সত্যি বিরল।

পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পাবনা কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শিবজিত নাগ বলেন, মোসতাফা সতেজ সমাজ গড়ার কারিগর। তিনি পাবনার সাংবাদিকতার জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে দীর্ঘদিন ধরে তিনি যেভাবে একটি মফস্বল শহরে থেকে ভালো কাজ করছেন তা বর্তমান সমাজে বিরল। মোসতাফা সতেজ বহুমুখী প্রতিভার একটি অনন্য উদাহরণ।

পাবনা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আঁখিনুর ইসলাম রেমন বলেন, প্রতিনিয়ত অভাব-অনটন এবং দুঃখ দুর্দশা উপেক্ষা করে যার কলম এখন এগিয়ে চলেছে সেই প্রতিভাবানের কলম যেন স্তব্ধ হয়ে না যায় সেই কামনা করি। তার সততা ও নিষ্ঠার প্রতি মুগ্ধ হয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর তার সঙ্গে আছি।

Advertisements
Share Button

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
খোঁজখবর.নেট এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!