৩৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের জন্মভিটা ফরিদপুরে নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন

মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯ | ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ | 775 বার

গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের জন্মভিটা ফরিদপুরে নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন
ফরিদপুর হাসপতাালের অভ্যন্তেরে এখানেই ছিল গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের জন্মভিটা। (ইনসেটে গৌরি প্রসন্ন মজুমদার)।
Advertisements
Share Button

‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি’ অথবা ‘মাগো ভাবনা কেন, শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি’। মহান মুক্তিযুদ্ধে হাজারো মুক্তিযোদ্ধাকে উজ্জীবিত করা চিরস্মরণীয় এমন গান সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা গৌরী প্রসন্ন মজুমদার। বিবিসি’র জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আধুনিক বাংলা গানের তালিকায় ঠাঁই পাওয়া গৌরি প্রসন্নের লেখা ‘কফি হাউসের সেই আডডাটা আজ আর নেই’ বাঙালী হৃদয়কে তোলপাড় করে আজো।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত গীতিকার আধুনিক বাংলা গানের যুগস্রষ্ঠা গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের ৩৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনার ফরিদপুরে জন্ম নেয়া বরেণ্য এই গীতিকবি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৬ সালের ২০ আগষ্ট। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ২০১২ সালে ‘‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’’ জানানো হয়।

ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগরে এই গীতিকবির পৈতৃক ভিটায় কালের প্রবাহে ধ্বংস হয়েছে তাঁর সবটুকু স্মৃতিচিহ্ন। নতুন প্রজেন্মর অনেকেই জানে না কে গৌরি প্রসন্ন, কোথায় তার বাড়ি। তাই বরেণ্য এই গীতিকবির স্মৃতি ধরে রাখতে পৈত্রিক ভিটায় সঙ্গীত একাডেমী গড়ে তোলার দাবী জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজ।

বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে বাংলা ছায়াছবি ও আধুনিক গানের জগতকে যাঁরা প্রেমাবেগে উষ্ণ রেখেছিলেন, গৌরি প্রসন্ন মজুমদার ছিলেন তাঁদের একজন। বাণী আর ছন্দের অভাবনীয় মেলবন্ধনে, কখনো উত্তম-সুচিত্রার ঠোঁটে, কখনো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, শচীন দেব বর্মন কিংবা আশা ভোঁসলের কন্ঠে তার লেখা গান বাঙালীকে আজও নিয়ে যায় স্বপ্নের দুনিয়ায়।

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগরের উদ্ভিদবিদ গিরিজা প্রসাদ মজুমদারের ছেলে গৌরী প্রসন্ন শৈশবে কলকাতায় চলে যান। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধকালে ফিরে এসে ভর্তি হন পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে। ১৯৫১ সালে ভর্তি হন কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করেন। পরে আবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। দেশবিভাগের পর ১৯৬৫ সালে স্বপরিবারে চলে যান ওপার বাংলায়। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের জন্মভিটা এখন ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

সম্প্রতি সরেজমিনে ফরিদপুরের গোপালনগরে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রধান ফটক দিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে কিছুদুর এগুলেই হাসপাতালের আবাসিক ভবন। চারিদিকে শুনসান নিরবতা। গাছপালা, সবুজ ঘাস ও লতাপাতায় ভরে গেছে হাসপাতালের আশপাশ। প্রাচির দিয়ে চতুর্দিক ঘেরা হাসপাতাল এলাকা দেখে বোঝার উপায় নেই যে, কোথায় ছিল গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের জন্মভিটা। স্মৃতিচিহ্ন বলতে রয়েছে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি তালগাছ আর একটি ঘাট বাঁধানো পুকুর। মূল বাড়ির ধ্বংসাবশেষে এখন জঙ্গল আর ময়লার স্তুপ। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে একবার নিজের পৈত্রিক ভিটা দেখতে এসেছিলেন গৌরি প্রসন্ন। সে সময় ছোটবেলার প্রিয় বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়েছিলেন।

স্বজনদের সন্ধান করে পাওয়া গেলো গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের দুঃসম্পর্কের ভাগ্নে সমেন্দ্র লাহিড়ী বাবলু কে। তিনি এসে হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারের দু’টি ভবনের মাঝখানের একটি জায়গা দেখিলে বললেন, সেখানেই ছিল গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের জন্মভিটা। আক্ষেপের সুরে তিনি বললেন, এত বড় মাপের একজন সঙ্গীতজ্ঞ গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, তার বাড়ি ছিল আমাদের ফরিদপুরে, অথচ আমরা তার স্মৃতি রক্ষার্থে কিছুই করতে পারলাম না, এটা কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানো যাবে না। সরকারের কাছে দাবি জানাবো, তার স্মৃতি ধরে রাখতে এখানে একটা সঙ্গীত একাডেমী গড়ে তোলা হোক।

গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের স্মৃতি বহন করছে ফরিদপুর হাসপাতালের অভ্যন্তরের এই পুকুরটি।

ফরিদপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আশুতোষ কর্মকার বলেন, প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি গৌরি প্রসন্ন মজুমদার পাবনার ফরিদপুরের সন্তান ছিলেন ভাবতেই ভাল লাগে, গর্ব হয়। গোপলনগরেই ছিল তাদের বসতভিটা, যেখানে এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু বর্তমানে তার স্মৃতি চিহ্ন কিছুই নেই। সাবেক পৌর কাউন্সিলর দীপক সরকার কাঞ্চন বলেন, এখানে তার তো কোনো স্মৃতিই নাই। গৌরি প্রসন্ন মজুমদার নামে যে একজন লোক ছিলেন, এ প্রজন্মের মানুষতো জানেই না। তাদের জানানোর উদ্যোগও নেয়না কেউ। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। ফরিদপুর সরকারি ইয়াসিন ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক আবু সাইদ বলেন, অত্যন্ত দু:খের সাথে বলতে হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের সামনে গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের কোনো স্মৃতি চিহ্ন নেই, যা দেখে তারা জানতে ও শিখতে পারবে। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি তার স্মরণে ফরিদপুরে স্মৃতি সংগ্রহশালা বা সঙ্গীত একাডেমী গড়ে তোলার দাবি জানান।

গৌরি প্রসন্ন মজুমদার পাবনার ফরিদপুরের সন্তান ছিলেন, সেকথা জানে না নতুন প্রজন্মের অনেকেই। তবে দীর্ঘদিন পর হলেও গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের স্মরণে সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা সহ নানা উদ্যোগের কথা জানালেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাংস্কৃতিককর্মীরা। ফরিদপুর বনমালী ললিতকলা একাডেমীর সভাপতি আলী আশরাফুল কবির বলেন, আমরা অনেকেই জানি গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের নাম। কিন্তু তিনি যে পাবনার সন্তান, ফরিদপুরের গোপালনগরের সন্তান তা অনেকেই জানি না। সেটা সবাইকে জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা তাঁর নামে ফরিদপুরে একটি সাংস্কৃতিক একাডেমী গড়ে তুলতে চাই। যে সংগঠনের কাজ হবে গৌরি প্রসন্ন মজুমদারকে বাংলাদেশে বাঁচিয়ে রাখা, তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে কাজ করা। সেইসাথে আগামীতে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মাধ্যমে তাকে স্মরণ করবো আমরা।

ফরিদপুর পৌর মেয়র খ ম কামরুজ্জামান মাজেদ জানান, আমরা বিভিন্ন সময়ে কিছু উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এবার ফরিদপুর পৌরসভার একটি সড়ক গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের নামে করবো। যাতে তার নাম সবার মাঝে ছড়িয়ে যায়। ফরিদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাপ হোসেন গোলাম বলেন, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিককর্মী, প্রশাসন সবাইকে সাথে নিয়ে আমরা গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের স্মরণে একটি ভাস্কর্য, অথবা একটি স্মৃতি পাঠাগার করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রতন কুমার রায় বলেন, ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মোট জমির পরিমাণ ২১ একর। এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে সরকার চাইলে হাসপাতালের অভ্যন্তরে স্মৃতি সংগ্রহশালা বা সঙ্গীত একাডেমী করতে পারে। তেমন জায়গাও আছে। এক্ষেত্রে তারা সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাবনার জেলা প্রশাসক কবির মাহমুদ জানান, আমি সদ্য যোগদান করেছি। আপনার মাধ্যমে জানার পর বিষয়টি ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে খোঁজ নিতে বলেছি। সেখানে সেই অর্থে গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের বসতভিটার স্মৃতি চিহ্ন কিছু নেই। আমরা চেষ্টা করবো সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এখানে গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের স্মৃতি ধরে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য। তিনি পাবনার গর্ব, ইতিহাসের এই অংশটুকু আমাদের ধরে রাখার দরকার।

জীবনের চল্লিশ বছর গানের জগতে কথা সাজানো আর মিল জুড়িয়ে গৌরীপ্রসন্ন বিদায় বেলায় নিজ গানেই আকুতি রেখেছেন, কবে কি বলেছেন তা মনে না রাখতে। জন্মভিটায় স্মৃতি সংগ্রহশালা গড়ে এ মহান শিল্পীকে জানানো হবে যথাযথ সম্মান, রইল সে প্রত্যাশা।

Advertisements
Share Button

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
খোঁজখবর.নেট এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!