গার্মেন্টস মালিকদের জন্য দৃষ্টান্ত সুবল চন্দ্র সাহা

সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ২:৩৪ অপরাহ্ণ | 606 বার

গার্মেন্টস মালিকদের জন্য দৃষ্টান্ত সুবল চন্দ্র সাহা
সুবল চন্দ্র সাহা
Advertisements

তার অধীনে চাকরী করেন তিন হাজারের বেশি শ্রমিক। করোনাভাইরাস থেকে রক্ষায় তার কারখানার সকল শ্রমিককে দুই মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে ৩৫ দিনের ছুটি দিয়েছেন। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিকাশের মাধ্যমে ঈদ বোনাস পাঠিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। পরিস্থিতি খারাপ হলে, প্রয়োজনে সবার ছুটি বাড়িয়ে দেবেন বলেছেন। জানিয়েছেন, চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। করোনায় কারো চাকুরি যাবে না।

ভাবছেন এমন মানুষও হয়। হ্যাঁ আশ্চর্যজনক হলেও সত্য। বলছি একজন মানবিক গার্মেন্টস মালিক সুবল চন্দ্র সাহার কথা। তিনি গাজীপুরের এসপি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই গুনি ও মানবিক মানুষটি পাবনার চাটমোহর উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা গ্রামের কৃতি সন্তান। যিনি খুব ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে, সংগ্রাম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে কারণে মানুষের কষ্ট তিনি সহজেই বুঝতে পারেন। তাই শ্রমিকদের জন্য তার ভালবাসা সবসময়।

তার কারখানায় আছে শ্রমবান্ধব পরিবেশ ও শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন ধরণের মানবিক সুবিধা। অনান্য গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের প্রতি তার কর্তব্য পালনের বিষয়টি ভালভাবে দেখেন না। এগুলো তাদের জন্য অস্বস্তিকর, কারণ তারা তাদের শ্রমিকদের এমন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেন।

সুবল সাহা কেবল ব্যবসায়ী নন, একজন দানশীল সমাজসেবকও। তিনি পাবনার ডায়াবেটিক হাসপাতালে অর্ধকোটি টাকা ব্যয় করে একটি ফিজিওথেরাপি সেন্টার করে দিয়েছেন। চাটমোহর, বেলকুচি ও ঢাকার বিভিন্ন স্কুল, আশ্রম ও ধর্ম প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনুদান প্রদান করেন। দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসীর চাকুরী-বিয়ে-চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কর্মে সহযোগিতা করেন।

আলাপকালে সুবল চন্দ্র সাহা বলেন, জীবনে বড় হতে হলে পরিশ্রম করতে হবে। সততা ও একাগ্রতা থাকতে হবে। ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, আমার যে ব্যবসা আছে, তা নিয়েই থাকতে চাই। কিছু ইউনিট বাড়ানোর কাজ চলছে। কিভাবে আরো কিছু মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা যায় সে চেষ্টা করছি। আর আমার সবকিছুই মানুষের কল্যাণের জন্য। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।

যেভাবে আজকের সুবল সাহা : পাবনার চাটমোহর উপজেলার প্রত্যন্ত পার্শ্বডাঙ্গা গ্রামে ১৯৫১ সালের ১৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম সুধাংশু কুমার সাহা। তিনি ভাঙ্গুড়ায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ১৯৭৯ সালে মারা যান তিনি। তার মা সিন্ধু রানী সাহা মারা যান ২০১৬ সালে। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড় সুবল সাহা। পার্শ্বডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের গন্ডি শেষ করে ভর্তি হন ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৭২ সালে ডিগ্রি পাশ করেন। বিয়ে করেন ১৯৭৭ সালে, স্ত্রীর নাম সবিতা সাহা। প্রথমে ভাঙ্গুড়াতেই চাল-ডালের ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন। এরপর পাবনায় তার পরিচিত বড় ভাই আতাউর রহমানের রাইস মিল, ডাল মিল ও তেল মিলের কারখানা দেখাশোনার পাশাপাশি তার সাথে ঠিকাদারি করেন ১৯৮৪-৮৫ সাল পর্যন্ত।

১৯৭১ সালে পাবনার তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার নুরুল কাদের খানের সাথে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যুদ্ধের কারণে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার দিলকুশায় বিএডিসি ভবনে ঠিকাদারীর বিল নিতে গিয়েছিলেন সুবল সাহা। সেখানে নুরুল কাদের খানের সাথে দেখা ও কুশল বিনিময়ের পর নিজের অফিসে নিয়ে যান সুবল সাহাকে। কি করছো, খোঁজখবর নেয়ার পর তিনি পরামর্শ দেন পার্টনারশীপ নিয়ে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী করার।

তারপরে সুবলের স্ত্রীর বড় ভাই ছিলেন ঢাকায়। পরামর্শ করলেন তার সাথে। যোগাড় করে দেন তিনজন পার্টনারও। তারা হলেন ভজন কুমার সাহা, মাহাবুবুর রহমান ও তার শ্যালক নাজমুল হক। ১৯৯০ সালে চারজন মিলে নারায়নগঞ্জের কিল্লারপুর নামক স্থানে ছোট্ট পরিসরে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী স্থাপন করে শুরু করেন ব্যবসা। নাম দেয়া হয় উত্তরা ফেব্রিক্স। এরপর নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে চার বন্ধু একসাথে গার্মেন্টস ব্যবসা পরিচালনা করেন ১৯৯৫-৯৬ সাল পর্যন্ত। তারপর ব্যবসার স্বার্থে আলাদা হয়ে যে যার মতো ব্যবসা শুরু করেন। তবে আলাদা হলেও চার বন্ধু প্রথম প্রতিষ্ঠান উত্তরা ফেব্রিক্স’র পার্টনারশীপ এখনও আছে। সেটি দেখাশোনা করেন মাহাবুবুর রহমান। অটুট আছে চার বন্ধুর সম্পর্কও। ১৯৯৭ সালের দিকে এসপি গ্রুপ দাঁড় করান সুবল সাহা। এসপি ফ্যাশান, এসপি নিটওয়্যার, এসপি ফেব্রিক্স, এসএম কটন ফেব্রিক্স সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এসপি গ্রুপ।

রানা প্লাজা ঘটনার পর নারায়নগঞ্জ থেকে সব কারখানা বন্ধ করে ২০০৮ সালে গাজীপুরে গিয়ে এএমসি নীট কম্পোজিট নামের একটি পুরোনো ফ্যাক্টরী কিনে নিয়ে নতুন করে শুরু করেন ব্যবসা। সেখানে এসপি ফ্যাশান নামের আরেকটি কারখানা তৈরী করেন। গাজীপুরের এই দুটি কারখানায় বর্তমানে কাজ করছেন ৩ হাজার ৩০০ জন কর্মচারী। তবে নারায়নগঞ্জে রয়েছে তার কোম্পানীর কর্পোরেট অফিস। সেখানেও কাজ করছেন ৫০ জন কর্মচারী। তার কারখানায় চাটমোহরের অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

ব্যক্তি জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। ছেলে সজল ও মেয়ে সোমা দু’জনেই বিবাহিত। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন তারা। ২০১৮ সালে মারা যান সুবল সাহার স্ত্রী সবিতা সাহা। আলাপকালে সুবল চন্দ্র সাহা জানান, আজকের সুবল চন্দ্র সাহার উঠে আসার পেছনে তার পরলোকগত স্ত্রী সবিতা সাহার সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে। আর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক তারা পাঁচ ভাই ও এক বোন। সুবল সাহার ব্যবসা উন্নয়নে তার ৪ নম্বর ভাই উত্তম কুমার সাহা ও ৫ নম্বর ভাই উদয় কুমার সাহার অনেকখানি অবদান রয়েছে বলে জানান।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!