অদম্য ওরা ৯ জন…

বুধবার, ০৩ জুন ২০২০ | ৭:১৯ অপরাহ্ণ | 420 বার

অদম্য ওরা ৯ জন…
Advertisements

গতানুগতিক নোট বা গাইড বই ছুঁড়ে ফেলে মুল বই আয়ত্ব করা, শিক্ষকদের কঠোর নির্দেশনা ও নজরদারি, আর নিজেদের মেধা, শ্রম, একাগ্রতা দিয়ে সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন তারা। আর দশটা শিক্ষার্থীর মতো মোবাইল বা ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে ডুবে না থেকে তারা ডুবেছিলেন লেখাপড়ায়। যার ফল জিপিএ-৫ লাভ।

বলছি অদম্য মেধাবী ৯ শিক্ষার্থীর কথা। যারা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। আশ্চর্যজনক হলো জিপিএ-৫ পাওয়া এই ৯ জন শিক্ষার্থীর সবাই ছাত্রী। তারা চাটমোহর উপজেলার চড়ইকোল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। এই স্কুল থেকে এবছর মোট ৭১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই উত্তীর্ণ হয়েছে। ৯ জন পেয়েছে জিপিএ-৫। এছাড়া এ গ্রেড ২৬ জন, এ মাইনাস ২১ জন, বি গ্রেড ১৪ জন এবং ১ জন সি গ্রেড পেয়েছে। আর যে ৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে সবাই ছাত্রী। কোনো ছেলে শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। এবারের ফলাফলই স্কুলটির এ যাবতকালের সেরা সাফল্য। আর এমন ফলাফলে স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, এলাকাবাসীর মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা।

জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা হলেন, চড়ইকোল গ্রামের তানজিলা তাবাসসুম তিথি। তার বাবা তসলিম উদ্দিন পাঠান ব্যবসায়ী ও মা কামরুন্নাহার খাতুন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা। রামপুর গ্রামের নুসরাত জাহান জেনি। তার বাবা আনিসুজ্জামান হাইস্কুলের শিক্ষক ও মা ঝর্না খাতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। একইগ্রামের তানিয়া খাতুন। তার বাবা তৈয়ব আলী মন্টু কৃষক ও মা আছিয়া খাতুন গৃহিণী। মস্তালীপুর গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস রিয়া। তার বাবা রবিউল ইসলাম কৃষক ও মা শিউলী খাতুন গৃহিনী। চড়ইকোল গ্রামের নুসরাত খাতুন। তার বাবা নাজিম উদ্দিন খাঁ কৃষক ও মা মল্লিকা খাতুন গৃহিনী। নাজিরপুর গ্রামের পাপিয়া খাতুন। তার বাবা পাঞ্জাব মন্ডল ব্যবসা ও মা মমতা খাতুন গৃহিনী। রামপুর গ্রামের জারিন তাসনিম কনা। তার বাবা আবুল কালাম আজাদ কৃষক ও মা হোসনেআরা খাতুন গৃহিনী। একইগ্রামের আশা খাতুন। তার বাবা আলাউদ্দিন রঙমিস্ত্রি ও মা ফরিদা খাতুন গৃহিনী। আনকুটিয়া গ্রামের সুমাইয়া খাতুন। তাদের বাড়ি খুলনার খালিসপুরে। এখানে তার খালা স্কুলশিক্ষিকা সুলতানা জাহান ও খালু সঙ্গীত শিল্পী বজলুল হক সুশানের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেন। এদের মধ্যে আশা খাতুন ও নুসরাত খাতুন পেয়েছেন গোল্ডেন জিপিএ-৫।

এমন ফলাফলের রহস্য জানতে চাইলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, স্কুলে নিয়মিত ক্লাস নিয়েছেন শিক্ষকরা। গাইড বই পড়তে দেননি, মুল বই পড়তে উৎসাহিত করেছেন সবসময়। বাড়িতে আমরা ঠিকমতো পড়াশোনা করি না কি না তার খোঁজ নিতেন শিক্ষকরা। সেকারণে ভাল গাইডলাইন আর সহযোগিতা পাওয়ায় এমন ভাল রেজাল্ট হয়েছে।

কৃতি শিক্ষার্থীরা তাদের সাফল্যের পেছনের আরো একটি কারণ জানাদে গিয়ে বলেন, চড়ইকোল প্রাইমারী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তাদের অনেকেরই জিপিএ-৫ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জিপিএ-৫ না পাওয়ায় তাদের প্রিয় মাসুদ রানা স্যার খুব কষ্ট পেয়ে কেঁদেছিলেন সেদিন। কারণ তিনি তাদের নিয়ে ভাল ফলাফলের স্বপ্ন দেখতেন। সেইদিন মাসুদ স্যারের কান্না দাগ কেটেছিল তাদের কোমল মনে। সেখান থেকে সবার একটা জেদ হয়েছিল ভাল ফলাফল করার। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পরও সবসময় তাদের উৎসাহ দিতেন মাসুদ স্যার। এভাবেই ভাল ফলাফল করতে পেরেছেন এসকল অদম্য ছাত্রীরা।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাপস রঞ্জন তলাপাত্র বলেন, ১৯৯৪ সাল থেকে স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। এবারের রেজাল্ট আমার দায়িত্বকালে সেরা সাফল্য। তিনি জানান, আমরা স্কুলে কোনো শিক্ষার্থীকে ফোন ব্যবহার করতে দিতাম না। নিয়মিত ক্লাস ও সাপ্তাহিক মাসিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হতো। বাল্যবিয়ে হয়ে যেত অনেকের, কিন্তু আমরা হতে দেইনি। ওরা নবম শেণীতে উঠার পর থেকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হতো। উৎসাহ দিতাম কোনো পড়া ফেলে রাখা যাবেনা, নিরুৎসাহিত করতাম গাইড বই যাতে কেউ অনুসরণ না করে। প্রতিবছর দুইবার করে মা সমাবেশ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার জীবনের মায়ের ভূমিকাকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ মায়েরা সবসময় শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। সর্বোপরি শিক্ষকদের নির্দেশনা সবসময় মেনে চলেছে তারা। এ সকল উদ্যোগের সম্মিলিত প্রয়াসই আজকের এই অর্জন।

স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি শমসের আলম বলেন, শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করতাম কিভাবে ভাল রেজাল্ট আনা যায়। আমরা শুধু শিক্ষকদের কাছে একটি জিনিস চেয়েছি শিক্ষার মান উন্নয়ন। যাতে স্কুলের সুনাম বয়ে আনে। শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে আসছে কিনা, ক্লাস নিচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হতো, সপ্তাহে দুইবার করে স্কুলে এসে খোঁজ খবর নিতাম। সবার পরিশ্রমে যে ফলাফল এবার আমরা পেয়েছি তা খুবই আনন্দের।

আর শুধু কেন ছাত্রীরাই জিপিএ-৫ পেলেন, কোনো ছাত্র কেন পেলেন না-এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান শিক্ষক তাপস রঞ্জন তলাপাত্র বলেন, মেয়েরা সবসময় পড়াশোনায় মনোযোগী। স্কুলে শিক্ষক ও বাড়িতে বাবা-মায়ের কথা শোনে। ফোন বা ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে না। কিন্তু ছাত্ররা বেশিরভাগ সময় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। গ্রামের বিভিন্ন মোড়ে ওয়াইফাই নেটে আসক্তি ছিল। স্কুলে ও বাড়িতে ঠিকমতো পড়াশোনা করেনি। বাবা-মা ও শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চলেনি। এসব মিলিয়েই ছাত্ররা জিপিএ-৫ পায়নি বলে মনে করা হচ্ছে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
khojkhobor.net-এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!